বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ডের উভয়েরই লক্ষ্য সিরিজে এগিয়ে যাওয়া মিয়ানমার থেকে ফিরলেন ১৭৩ বাংলাদেশি আপিল বিভাগে ৩ বিচারপতি নিয়োগ মন্ত্রী-এমপির স্বজনরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে ব্যবস্থা: কাদের ফিলিপাইনে তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তর কোরীয় প্রতিনিধি দলের ইরান সফর খালেদা জিয়ার গ্যাটকো মামলায় চার্জশুনানি ২৫ জুন অফশোর ব্যাংকিংয়ে সুদের ওপর কর প্রত্যাহার রানা প্লাজায় নিহতদের স্মরণ দেশের হজ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের মধ্যে স্মার্ট হবে: ধর্মমন্ত্রী থাইল্যান্ডে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তাপদাহের মধ্যে গ্রামে ১০৪৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলো জ্যামাইকা সুইজারল্যান্ডে জব্দ রয়েছে রাশিয়ার ১ হাজার ৪শ’ কোটি ডলার জিবুতি উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবিতে নিহত ৩৩

জ্বালানির দাম পূর্বাবস্থায় ফিরবে কবে?

ফজলুল কবির
আপডেট : ডিসেম্বর ২১, ২০২২
জ্বালানির দাম পূর্বাবস্থায় ফিরবে কবে?

ইউক্রেন যুদ্ধের অব্যবহিত প্রভাব হিসেবে গোটা বিশ্বেই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। নয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কম-বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় সবার মাথাতেই এক প্রশ্ন, কবে জ্বালানি তেলের দাম আগের পর্যায়ে পৌঁছাবে? কারণ, এর সাথেই যুক্ত নিত্যপণ্যের দামসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়াদি।

চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সামরিক অভিযান দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছে, তা এখনো চলমান। এর সাথে পরোক্ষভাবে পুরো পশ্চিমা শক্তি জড়িয়ে পড়েছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এই জড়িয়ে পড়া এবং রাশিয়ার নিজ অবস্থানে অটল থাকার জেরে এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা প্রবল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামে।

গোটা ইউরোপ গ্যাসের জন্য রাশিয়ার ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। অঞ্চলটির মোট জ্বালানি চাহিদার ২৫ শতাংশের মতো আসে রাশিয়া থেকে। গ্যাসের প্রসঙ্গ এলে এর হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ গ্যাস সরবরাহের জন্য নর্ড স্ট্রিম ১ ও ২-এর ওপর নির্ভরশীল। এই দুটি পাইপলাইনই এখন বন্ধ আছে। এ কারণে চলতি শীতের আগে থেকেই গেম অব থ্রোনসের মতো করে বারবার পশ্চিমা মিডিয়ায় বলা হচ্ছিল-উইন্টার ইজ কামিং।

জ্বালানি আক্ষরিক অর্থেই একটি দেশের অর্থনীতির জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এর সাথে জড়িয়ে থাকে অর্থনীতির ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক সবগুলো খাত। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের ওপর। হচ্ছেও তাই। বেশি দূর নয় বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যাবে। নিত্যপণ্যের দাম ক্রমেই বাড়ছে। সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় একটি প্রশ্নই বারবার করে সামনে আসছে- জ্বালানির দাম কবে পূর্বাবস্থায় ফিরবে? এই পূর্বাবস্থা বলতে ইউক্রেন যুদ্ধের আগের পর্যায়ের কথা বলা হচ্ছে।

ইউরোপের দেশগুলো এরই মধ্যে জ্বালানি কম ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। ব্রিটেন যেমন দীর্ঘমেয়াদি মন্দার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ আর কিছুই নয় জ্বালানির অতি উচ্চমূল্য। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিজ নাগরিকদের সতর্ক করে গত আগস্ট মাসেই বলেছেন, প্রাচুর্যের যুগ শেষ। জার্মানি সব নাগরিক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটি সীমা পর্যন্ত জ্বালানির দাম পরিশোধে ভর্তুকি ঘোষণা করেছে।

সবাই ধরেই নিয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। খেরসন থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহারের পর যে আশা দেখা দিয়েছিল, তা মিইয়ে গেছে অনেকটাই। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার শান্তি আলোচনার জন্য ইউক্রেনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর শঙ্কা, রাশিয়া নত হবে না। সে ক্ষেত্রে এ যুদ্ধ আরও বাজে, মানে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দতাই ইউক্রেনকেই এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি, যা এরই মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট সহজে মেটার নয়। কিছুদিনের মধ্যে সুসংবাদ পেলেও জ্বালানি পরিস্থিতি ইউক্রেন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে যেতে দুই বছর সময় লাগতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

হ্যাঁ, কিছু সুসংবাদ অবশ্য আছে। মোটাদাগে জ্বালানির দামের দিকে তাকালে মনে হতে পারে পরিস্থিতি তো আগের চেয়ে সহনীয়। কারণ, গত আগস্টের তুলনায় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম অনেকটাই কমেছে। গত আগস্টে ইউরোপের বাজারে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা গ্যাসের দাম যেখানে ছিল ৩৩৮ মার্কিন ডলার, ১১ ডিসেম্বর তা নেমে ১৪৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম আগস্টের ১২৮ ডলারের বদলে ১১ ডিসেম্বর ৭৬ ডলারে এসে পৌঁছায়। এটা নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে ভালো।

মন্দ খবর হচ্ছে, এখনো এ দাম ইউক্রেন যুদ্ধের আগের পর্যায়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্লেষকেরা এ দাম সহজে নামবে বলেও আশা করছেন না।

লন্ডনভিত্তিক নিত্যপণ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিআইএসের জ্বালানি বিশ্লেষক টম মারজেক-ম্যানসারের মতে, এমনকি বিশ্ব হয়তো জ্বালানির দাম আবার বাড়তে দেখতে পারে। যেসব কারণে জ্বালানির দাম কমে এসেছে, তা ২০২৩ সালে নাও থাকতে পারে।

কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বরে জ্বালানির দাম কমার কারণ হচ্ছে, জি-সেভেন সম্মেলনে রুশ জ্বালানি তেলের দামে সীমা টেনে দেওয়া হয়েছে। এটি ২০২৩ সালেও চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন জানাচ্ছে, ২০২৩ সালে জ্বালানি তেলের গড় দাম ৯২ ডলারের আশপাশে থাকার আশঙ্কা প্রবল, যা ২০২১ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি।

এখন তাহলে জ্বালানি ব্যবহার কীভাবে কমাল ইউরোপ? বিশেষত এই শীতে? এর উত্তরে বলতে হবে, ইউরোপ এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছে। আল-জাজিরা জানাচ্ছে, এবারের শরতে ইউরোপে কম শীত পড়েছে। এ ছাড়া অতি উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ আগে থেকেই সতর্ক ছিল। তারা চেয়েছে ক্ষণিকের এই সংকট দাঁত কামড়ে পার হয়ে যেতে। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়াটা তাদের আশা দেখিয়েছে। ফলে চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে ইউরোপ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ কম জ্বালানি ব্যবহার করেছে।

এদিকে সংকট সামাল দিতে ইউরোপের দেশগুলোও জ্বালানি মজুত করেছিল বেশি। এই দুই মিলেই অঞ্চলটিতে জ্বালানির দাম বছরের শেষ দিকে এসে কমানো গেছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্বালানি, জলবায়ু ও সম্পদবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হেনিং গ্লোয়িস্টেইন বলছেন, ২০২৩ সাল একইভাবে যাবে, এমনটা বলা যায় না। শীতের শেষদিকে ঠান্ডা বাড়তে পারে, যা জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে দেবে। চাহিদার বিপরীতের জোগানে টান পড়বে তখন। পরের বছরও একইভাবে মজুত রাখা তখন ইউরোপের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।

এ তো গেল গ্যাসের বিষয়াদি। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন। যুদ্ধ চললেও রুশ জ্বালানি তেলের ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা সে অর্থে কিন্তু কমেনি। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি লিখেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও উইলসন সেন্টারের ফেলো হ্যারি সেশাসে। তিনি জানাচ্ছেন, যাবতীয় সংকটের মধ্যেই রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনছে ইউরোপ। রাশিয়া থেকে জীবাশ্ব জ্বালানি কেনা বাবদ ইউরোপ দিনে এখনো ২৬৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।

ফিনল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারও একই রকম তথ্য দিচ্ছে। গত এপ্রিলে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি কেনা বাবদ ইউরোপ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করত। সেপ্টেম্বরে এসে তা কমে এক চতুর্থাংশে নেমে এলেও নির্ভরতা এখনো কিন্তু অনেক বেশি। এদিকে একই সময়ে দেশটি থেকে জ্বালানি তেল কেনা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে চীন ও ভারত। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কবলে পড়ার মতো বাজারের বিস্তার হচ্ছে।

আবার এই সংকট যে সরবরাহ উৎস বদলেই সমাধান করা যাবে, এমন নয়। কারণ, রাশিয়ার জ্বালানি তেলের সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে সেই শূন্যতা মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এই চেষ্টা এরই মধ্যে হয়েছে। কিন্তু তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ অনেক বড় বাধা।

আগামী বছরের জানুয়ারি বলে দেবে আদতে কী হবে। কারণ, শীত যত বাড়বে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়বে গ্যাস ও তেলের দাম। গ্যাসের দাম এরই মধ্যে গত এক মাসে ৪০ শতাংশের মতো বেড়েছে। যদিও তা গত আগস্টের তুলনায় কম। কিন্তু প্রবণতা বাড়তির দিকে। সাথে আছে চীন ফ্যাক্টর।

চীন বহু বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ। ২০২১ সালে দেশটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ এলএনজি আমদানিকারক দেশেও পরিণত হয়। কিন্তু কঠোর কোভিডনীতির কারণে দেশটিতে উৎপাদন কমেছে। সাথে পাল্লা দিয়ে কমেছে জ্বালানি চাহিদা। এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়ে ইউরোপ এবারকার মতো সংকট মোকাবিলা করেছে। কিন্তু চীনে হওয়া সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কোভিডনীতি কিছুটা শিথিল করেছে সি চিন পিং সরকার। ফলে ২০২৩ সালে দেশটিতে জ্বালানি চাহিদা আবার বাড়বে। ফলে জ্বালানির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা দামের পালে হাওয়া দেবে।

আর জ্বালানির দাম বেশি মানেই যাবতীয় ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি মানেই মূল্যস্ফীতির চক্র। এই অনিঃশেষ চক্র থেকে খুব সহসা মুক্তি নেই। অন্তত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আগ পর্যন্ত এটা বলারও সুযোগ নেই যে, কবে কীভাবে জ্বালানির দাম কমবে। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী দশায় ফেরার বিষয়টি তো তার পরের অঙ্ক।

লিখেছেন: ফজলুল কবির, ইনডিপেনডেন্ট টিভি


এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ