ইরানে ঠিক কী চান ট্রাম্প ?
- আপডেট সময় : ০২:১১:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক কী, তা এখনও স্পষ্ট করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি তিনি কূটনৈতিক সমঝোতার কথাও বলছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়লেও সম্ভাব্য সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও, দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা স্পষ্ট করেননি। ইতোমধ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও বহুসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছেন। ফলে পরিস্থিতি যে কোনও সময় বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর সীমিত আঘাত হানতে চান? নাকি ইসরায়েলের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে চান? এমনকি তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টাও কি তার পরিকল্পনায় আছে? অবশ্য ইরান আগেই সতর্ক করেছে যে হামলা হলে কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, পারমাণবিক চুক্তি না হলে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত তিনি ‘১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে’ নেবেন। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে বিভিন্ন সামরিক বিকল্প দেখানো হয়েছে। আর এসব বিকল্পের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেয়িকে সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু করার প্রস্তাবও রয়েছে।
ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তিনি কূটনৈতিক পথেই সমাধান চান, আর সেই সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ইরান এসব শর্ত মানতে রাজি নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি ওমান ও সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দফা পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাতে দুই পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি আসেনি। আগামী বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আবারও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান ‘আত্মসমর্পণ’ না করায় ট্রাম্প বিস্মিত।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এমন একটি সীমিত সংঘাত চায়, যা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ফেলবে না।
ভাতাঙ্কার ভাষ্য, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর এবার যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমেয়াদি কিন্তু উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান চালাতে পারে বলে ইরান এখন ধারণা করছে। তেহরানের ধারণা, সম্ভাব্য সেই হামলা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হয়েছে। মূলত গত বছরের জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে উভয় দেশের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা হয় এবং এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও স্বল্পসময়ের জন্য জড়িয়ে পড়ে ও ইরানের পারমাণবিক বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়।
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। তখন ট্রাম্প কয়েকবার ইরানি জনগণকে ‘সহায়তা’ করার কথা বললেও বাস্তবে কোনও পদক্ষেপ নেননি।
ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এনেছেন, বিশেষ করে গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে তার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ করে তিনি এই দাবি করে থাকেন। যদিও ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া গাজার এই যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। মার্কিন রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্টের মতে, ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা জোরদার হবে।
তবে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সহিংস সংকটে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা বলছেন, যুদ্ধ ঘোষণা করার একমাত্র সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের, তাই এ বিষয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ৯ টি ডেস্ট্রয়ার ও তিনটি ফ্রিগেট। এছাড়া আরও যুদ্ধজাহাজ এই অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে গত শুক্রবার জিব্রাল্টার প্রণালি পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
বিমানবাহী রণতরীগুলোতে থাকা বহু যুদ্ধবিমান ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে ডজনখানেক অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। সংঘাত শুরু হলে এসবই ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড হ্যাস বলেন, যে কোনও মাত্রা ও সময়সীমার সংঘাত ইরানের সরকারের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তার মতে, এতে ইরানের সরকার দুর্বলও হতে পারে, আবার উল্টো শক্তিশালীও হয়ে উঠতে পারে। আর যদি সরকার পতন হয়, তার পর কী ধরনের শাসন আসবে তা অনুমান করা কঠিন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেট শুনানিতে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পতন হলে কী ঘটবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কেবল আশা করা যায়, দেশটির ভেতরে এমন কেউ থাকবেন যার মাধ্যমে রূপান্তরের পথ তৈরি হতে পারে।
অবশ্য ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলো ট্রাম্পকে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, প্রতিশোধমূলক হামলায় তারাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এবং এতে করে পুরো এই অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, ইরান ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছিল।
তার মতে, ইরানে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে। তাই শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে।

























