ঢাকা ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে জয়ী হলে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে: নাহিদ ইসলাম

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:১০:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নির্বাচনে জয়ী হলে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। নিপীড়নের ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটন করা হবে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জাতির উদ্দেশে দেয়া নির্বাচনি ভাষণে এসব কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জোটে প্রার্থী নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বের দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেইনসাফি বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।

ভাষণে তিনি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে লুটপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি নতজানু অবস্থান পরিহার করে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতি গ্রহণের কথা বলেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ সবার সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও ছিল তার ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জননিরাপত্তার গণসংস্থায় রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

বিচার বিভাগ সংস্কার, শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা, নারীর সমঅধিকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে দুর্নীতি বন্ধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথাও বলেন এনসিপি আহ্বায়ক।

ভাষণের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রাখে, তবে বৈষম্য, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে— যেখানে রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে।

নাহিদ ইসলামের পুরো বক্তব্য হুবহু

সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ অভিমুখী ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর গত ৫৫ বছরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল এবং ক্ষমতাসীনদের সংস্পর্শে পৌঁছাতে পেরেছে, তারাই শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে গেছে।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান শর্ত। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থাতেও প্রভাবশালীদের জন্য অবৈধ ও বিশেষ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা রাজনীতিক, আমলা ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একটি চক্র রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ব্যাংক ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে, আর সাধারণ মানুষ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সংগ্রামেই ব্যস্ত থেকেছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে। পরিকল্পিতভাবে এই মহানগর ও তার আশপাশে বসবাসকারী দুই কোটি মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বড় বড় সব অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। আর এদের মাথার ওপর বসে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি ছোট্ট ধনীক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। যারা অসৎ উপায়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন হলে তা দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। গ্রাম, মফস্বল শহর ও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষিত জনদাবি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বেকার দুর্নীতিগ্রস্ত বেইনসাফের বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।

ফ্যাসিস্ট যুগে সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার হবে
দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সকল অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই এমন সকল সরকারি বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়েছে। তার এই অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পরে এর সবগুলোই ভেঙে পড়েছে। এতে নেতৃত্বপ্রদানকারী হোমড়া-চোমড়াদের কিছু লোক পালিয়েছে, কিছু বিচারের আওতায় এসেছে, অনেককে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। বহু সামরিক-বেসামরিক আমলা ও বিচারক এখনো কর্মে নিয়োজিত রয়েছে।

জুডিশিয়ারি, সিভিল সার্ভিস ও পুলিশ বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্ব ভেঙে পড়লেও ডিফেন্স সার্ভিস এখনও অটুট রয়েছে। তবে হাজার হাজার খুনি, লুটেরা, অপরাধীর সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া, সেখান থেকে নিরাপদে দেশান্তরিত হওয়া, কর্মস্থল থেকে কিছু জেনারেলের পালিয়ে যাওয়া, অবসরপ্রাপ্তদের বৈরিরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া, রিটায়ার্ড কিছু অফিসারের ব্যক্তিগত তথ্য জনসম্মুখে ফাঁস করে তাদের জব্দ করার সেনাগোয়েন্দাদের চেষ্টা জনসমাজে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক অমর্যাদা ঘটিয়েছে।

আমরা স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি— বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।

খুনি হাসিনাকে উৎখাত করার পর এই সকল অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মেজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নামানো হয়েছে। কিন্তু সুপিরিয়র কামান্ডের অনাগ্রহের কারণে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা, অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেফতারের মতো কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।

গুমবিষয়ক কমিশন ১,৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা তথ্য ও আলামত নষ্ট করে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরা অসহযোগিতা করেই চলেছে।

আমাদের লড়াই হবে সেই ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা, যা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সকল প্রবণতা সমাজ থেকে মুছে ফেলা।

ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার হবে
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট আওয়ামী ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে— যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার লুটপাটকৃত এই বিশাল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর কথা বললেও তাদের অবহেলা ও অজ্ঞতার কারনে এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত ফ্যাসিবাদী যুগের সুবিধাভোগী কিছু শীর্ষ আমলা ও বিশেষজ্ঞেরা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করায় এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার বিঘ্নিত হয়েছে।

দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। লুটপাট ও অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।

বিদেশে পাচারকৃত এদের যে অর্থ ইতিমধ্যে শনাক্ত হয়েছে তা বাংলাদেশের কর বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে জরিমানাসহ টেক্স বসিয়ে দেশে থাকা তাদের সমুদয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একই সঙ্গে চিহ্নিত লুটপাটকারীদের গণশত্রু ঘোষণা করে এদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট্র’-এর মালিকানায় নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাজীবীদের নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও স্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট কাঠামোর মাধ্যমে নবগঠিত এই সংস্থাটি পরিচালনা করা হবে।

আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।

পররাষ্ট্রনীতি: নতজানু কূটনীতি থেকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অবস্থান,
খুনি হাসিনার আমলে বাংলাদেশ একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আবদ্ধ ছিল। দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম কার্যত ইন্ডিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো, ফলে স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন কায়েম করা ও জারি রাখার সকল পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হতো দিল্লি থেকে। বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ফেলা, শাসন ব্যবস্থাকে গণবিরোধী করে তোলা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়ার সকল আয়োজন করা হয়েছে ইন্ডিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী।

বছরের পর বছর ধরে, সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে ইন্ডিয়ার খুনে বাহিনী বিএসএফ শত শত বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করলেও খুনি হাসিনার সরকার চুপ করে থেকেছে। ফ্যাসিবাদী যুগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট সচিবগণ এবং বিজিবির মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসাররা ইন্ডিয়ার এই অসভ্য মানবতাবিরোধী আচরণের পক্ষে সাফাই গেয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। পৃথিবীর শত্রুভাবাপন্ন ও যুদ্ধরত দেশের সীমান্তেও এভাবে বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করে খুন করার নজির নেই।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’— এই স্লোগান আওড়ালেও বাস্তবে খুনি হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ইন্ডিয়ার নির্দেশ পালন করা। সে কারণে পাকিস্তানের প্রতি সর্বক্ষেত্রে বৈরি আচরণ করা হতো। বাস্তবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ইন্ডিয়ার পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল তারা। তখন ঢাকার এই ফ্যাসিস্ট শাসকরা মনে করত দিল্লি তাদের ঔপনেবেশিক শাসনের কেন্দ্র। সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল তাতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারো ওপর অতি নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়াতে সার্ক পুনরোজ্জিবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাব।

প্রবাসে থাকা নাগরিকদের সমস্যা সমাধান ও দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল প্রান্তে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করা এবং কূটনীতিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। লক্ষ্য হবে, পৃথিবীর সম্ভাবনাময় সকল দেশে নামমাত্র খরচে জনবল রপ্তানি করা এবং তারা যাতে কোথাও কোনোভাবে হেনস্থার শিকার না হয়, সেই সুরক্ষা দেওয়া। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

গণপ্রতিরোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুব-সমাজ সমর্থিত উচ্চপ্রযুক্তি নির্ভর সশস্ত্রবাহিনী,
খুনি হাসিনা তার শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে দলীয় স্বার্থে নিজ দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এর ফলে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কার্যত দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। যখন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট তৈরির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা এখনো তৃতীয় প্রজন্মের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছি।

বর্তমান কাঠামোতে ডিফেন্স বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য একটি অকার্যকর ও অস্থিতিশীল ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতকে কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী করতে হলে এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।

আমরা যদি সরকার গঠন করতে পারি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করব। আমাদের লক্ষ্য হবে বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং গুণগত মান বৃদ্ধি করা। পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাই-টেক বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে।

একই সঙ্গে দেশের সকল ১৮ ঊর্ধ্ব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলেটারি ট্রেনিং চালু করা হবে, এতে দেশব্যাপী জনভিত্তি সম্পন্ন এক গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফলে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমবে।

দ্রব্যমূল্য: ন্যায্য বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে স্বস্তি ফেরাবো
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য মূল্যে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যে মানুষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের ভূমিকা হবে সক্রিয়ভাবে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের মূল্য সবসময়ই সর্বাধিক। এর কারণ, এদেশে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করে। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। এমন দুষ্টু চক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি প্রমাণিত হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।

কৃষকরা যাতে তাদের শস্য ও কৃষিপণ্য কাউকে কোনো চাঁদা বা তোলা না দিয়ে বিক্রি করতে পারে এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদেরকেও যেন কাউকে কোথাও এক টাকাও না দিতে হয়, সরকার তা নিশ্চিত করবে। কঠোরভাবে এই পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করা গেলে, বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অযৌক্তিকভাবে সারাদেশে সাধারণ মানুষকে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। সরকার ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা এবং ওএমএস কর্মসূচি বিস্তৃত করবে। যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সহজে সুলভে পণ্য কিনতে পারে।

প্রতিবেশী বৃহৎ দেশটির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো হবে যাতে কেউ আমাদের পণ্যবন্দি করে বিপদে ফেলতে না পারে।

বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাদের সহজলভ্য ঋণ ও সরকারি সমর্থন দেওয়া হবে। কাঁচাপণ্য সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের জন্য ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবহন ও এর ব্যয় ন্যায়সঙ্গত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মৌসুমি পণ্যের জন্য সরকারিভাবে আগাম পরিকল্পনা করে মাল কিনে তা মজুত করা হবে। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট— একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা: দলীয় বাহিনী ভেঙে জননিরাপত্তার গণসংস্থা
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী কার্যত একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মতো পুলিশকেও ‘পুলিশলীগ’ নামে ডাকতে শুরু করেছিল। দেশে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা তখনকার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়নি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও পুলিশ ব্যাপক নৃশংসতা করেছে। আমরা সরকার গঠন করলে, জুলাই বিপ্লবের সময় এবং এর পূর্বাপর ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি করে অর্থ লোপাট ও ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল— তাদের প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় আনা হবে।

এমন সকল বিচার সম্পন্ন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশকে খোলনলচে বদলে পুনর্গঠন করা হবে। দেশ ও জনগণের সেবা হবে পুলিশের একমাত্র মন্ত্র। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় সংকীর্ণ মনোভাবের সংস্কৃতিকে কবর দিয়ে বাহিনীকে জন নিরাপত্তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা নিম্নলিখিত দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করব:

প্রথমত, দেশবাসীর মতামত নিয়ে, ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন ও নানান জুলুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহনী’ বা অন্যকিছু রাখা হবে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানেই পদায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সমান সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে।

বিচার বিভাগ: অন্যায়ের গোলকধাঁধা ভাঙবে কীভাবে,
বাংলাদেশে বিচার চাওয়া আজ দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং অনেক সময় হতাশাজনক এক যাত্রা। একজন মজলুম মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান, তখন তিনি শুধু একজন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়— একটি জটিল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। থানায় মামলা নিতে অনীহা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে তারিখের পর তারিখ পড়া এবং ব্যাপক অর্থ ব্যয়ের চাপ— সব মিলিয়ে বিচার এদেশে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।

আর ঘুষ? আদালতের দরজায় পা রাখলেই যেন শুরু হয় অবৈধ লেনদেন। নথি নড়াতে টাকা, তারিখ পেতে টাকা, আদেশ পেতে টাকা— ঘুষের বাজারের মহা হই-হুল্লোরের মধ্যে বিচারের বাণী স্তব্ধ হয়ে গেছে! ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য বলছে, বিচার নিতে গিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। সরকারের লিগ্যাল এইড আইন অনুযায়ী গরিব ও মজলুম মানুষের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও এর কোনো সুবিধা নিচে পড়ে থাকা মানুষ পায় না। বাস্তবে বিচারক, উকিল, মোক্তার ও দালালচক্রের এক জালে সাধারণ মানুষ আটকে যায়, দিশাহীন চক্রে ঘুরপাক খায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার চাওয়া বিচারপ্রার্থীদের জন্য শাস্তি ও ভোগান্তি হিসেবে হাজির হয়। বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে অর্থবিত্ত, সময়, শারিরীক সামর্থ এবং জীবনের স্বপ্নও হারিয়ে যায়। ধীরে চলা বিচার অন্যায় ও অবিচারকে বলশালী করে তোলে।

আজ বিচার ব্যবস্থা রাজনীতিক প্রভাব, অর্থশক্তি ও সুবিধাবাদী চক্রের মাধ্যমে কলুষিত। জেলা আদালত থেকে সর্বোচ্চ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত একই অন্ধকারের ছায়া আমরা দেখেছি, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এটা আরও বিস্তৃত ও অধঃপতিত হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, তাদের ইচ্ছামতো রায়ও জুটে, বিরোধীদলে যারা থাকেন তাদের মামলা বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে।

ভয়ংকর এই অশুভ চর্চার কারণে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়েছে। এরা তাদের সকল গৌরব, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত সকল স্তরে ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগ করে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিচারকের সংখ্যা বহুগুণে বাড়াতে হবে, পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে, ঘুষ দুর্নীতি নির্ভর রায় বেচা-কেনার চলমান আয়োজন ভেঙে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই এনসিপির অঙ্গীকার।

শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ: কেন্দ্র ভেঙে ক্ষমতা ছড়িয়ে দেব প্রান্তে,
বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো এখনও ব্রিটিশ ঔপনিবেশ সৃষ্ট পুরোনো মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ক্ষমতা ভয়াবহভাবে কেন্দ্রীভূত। দেশের প্রচলিত শাসন সংস্কৃতিতে রাজনীতিক, আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাকে ধরে রাখছে। ফলে ঢাকার অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয় না, যা উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত করে এবং জনগণের প্রয়োজন উপেক্ষিত থাকে।

খাদ্য, কৃষি, বস্ত্র, গৃহায়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকল্যাণ, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নারী-শিশু উন্নয়ন এবং স্থানীয় অবকাঠামোগত সেবার মতো অধিকাংশ দায়িত্ব উপজেলা পর্যায়ে হস্তান্তর করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি কমবে, স্থানীয় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসূচী নেওয়া ও তা বাস্তবায়ন হবে এবং জনগণ সেবা পাবে। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় অবকাঠামোর মতো বড় বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। অন্যদিকে উপজেলা ও পৌর প্রশাসন জনগণের দৈনন্দিন সেবা নিশ্চিত করবে, এমনটিই উন্নত দেশগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে চালু আছে।

বিচার ব্যবস্থার জট কমাতে উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ও আয়োজন করা হবে, যাতে ছোটখাটো বিরোধে স্থানীয়ভাবেই দ্রুত সমাধান পায়। একইভাবে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি জননিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে নাগরিকদের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা যায়।

জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। প্রতিটি স্তরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। যেকোনো পর্যায়ের স্থানীয় সরকারে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক-পাস যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হবে।

শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
ভেজাল ছাড়া কোনো খাদ্যপণ্য নাই: এই অপরাধ চলতে দেয়া হবে না

বর্তমানে দেশে এমন কোনো খাদ্যপণ্য পাওয়া কঠিন যা ভেজালমুক্ত। দীর্ঘমেয়াদে এই ভেজাল নানান জটিল রোগ সৃষ্টি করছে, মানুষের সুস্থতা ও আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করছে। যদিও দেশে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন রয়েছে, বাস্তবে বিশাল এই ভেজালের সাম্রাজ্যের ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্বে থাকলেও ঘুষ ও দুর্নীতির বিনিময়ে তারা চোখ-কান বন্ধ করে রাখে।

ভেজাল কারবারের এই সাম্রাজ্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যাদের বিরুদ্ধে আইন-কানুন প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই অবস্থার অবসান ঘটাতেই হবে। জনগণের সুস্বাস্থ্য রক্ষার যে অধিকার তার সঙ্গে আপোষ করা যাবে না। ব্যবসা করা অপরাধ নয়, কিন্তু সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্যের গুণগত মান শতভাগ নিশ্চিত না করলে অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

আমাদের কার্যকর পদক্ষেপসমূহ

• ভেজালকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা

• বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ড নিশ্চিত করা

• ভেজালকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া

• বাজার, আড়ত, কারখানা ও আমদানিকৃত খাদ্যে নিয়মিত র‌্যান্ডম টেস্টিং চালু করা

• BSTI ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা

• জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল ফুড টেস্টিং ল্যাব চালু করা

• ভেজাল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা

• ভোক্তাদের জন্য কার্যকর হটলাইন ও অভিযোগ অ্যাপ চালু করা

• নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের জন্য স্বীকৃতি ও প্রণোদনা প্রদান

• ভেজালের বিরুদ্ধে তথ্য দিলে নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা

• অভিযান ও পরিদর্শনে জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— জনগণের খাদ্য নিরাপত্তাকে আপসহীন অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ভেজালের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি প্রয়োগ করা।

ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর সংস্কৃতি ও নিজস্বতার প্রতি শ্রদ্ধা
আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় বিভাজনের কারণ না হয়ে এর ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, সহাবস্থান ও স্বাধীনতা। আমাদের লক্ষ্য একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, যেখানে নাগরিকের সমঅধিকার তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও পরিচয়ের উর্ধ্বে স্থান পাবে।

সকল ধর্ম ও জাতিগত গোষ্ঠীর সমান নিরাপত্তা: সংখ্যালঘু হলেও কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা সহিংসতার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ থাকবে, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কোনো বিভেদ ও বৈষম্য মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের স্বপ্ন এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা যেখানে মানুষকে তার ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ে নয়, বরং মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করা হবে।

ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা: বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে। অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতা নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সকলের সহাবস্থান থাকবে। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।

পোশাকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: প্রত্যেক নাগরিক নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন। একজন ধর্মবিশ্বাসী নারী যেমন হিজাব বা বোরকা পরতে পারবেন, তেমনি অন্য সকলে যেভাবে আধুনিক পোশাক পরেন, তা পরিধানের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দই অগ্রগন্য হবে। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ জীবনধারা আরোপ করবে না; ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

ভয় ছড়ানোর অপরাজনীতি মোকাবিলা: দেশটা ‘চরমপন্থায় চলে যাচ্ছে’ বলে একটি মহল আজ আবার নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। দেশবাসী ভুলে যায়নি, ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন চালু ছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ছিটকে পড়া কায়েমি স্বার্থবাদী মহল অচল হয়ে যাওয়া সেই সকল কথা নতুন মোড়কে উপস্থাপন করছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সমাজ সহনশীল ও বহুত্ববাদী; এই ঐতিহ্যকে আরও বলবান করা হবে।

ঘৃণাবিরোধী নীতি ও সামাজিক সম্প্রীতি: ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত ঘৃণা বা উস্কানিমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও গণমাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহনশীলতার মূল্যবোধ প্রচার করা হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের সম্মিলিত ঐতিহ্যের অংশ। রাষ্ট্র এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখবে এবং সাংস্কৃতিক চর্চা ও পরিচয় সংরক্ষণে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেখানে সংখ্যালঘু মুসলমানরা প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হন এবং তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদরাসা ধ্বংসের ঘটনা ঘটে, সেখানে বাংলাদেশে উস্কানীমূলক পরিস্থিতিতেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দির রক্ষায় এগিয়ে যায় মুসলমানরা। আমরা সরকার গঠনের সুযোগ পেলে, সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। সকল ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।

নারী প্রশ্ন: সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলবে
নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করাই হবে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। আমরা বিশ্বাস করি, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাঙ্গন, যানবাহন, জনসমাগমস্থল, এমনকি ঘরের ভেতরেও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরি, রাজনীতি, জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারসহ সকল পর্যায়ে নারীদের যৌক্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত করা হবে।

গৃহস্থলে সহিংসতা, যৌন হয়রানীসহ সকল ধরনের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। অতীতের অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে, সরকার অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ভয়ংকর ঘটনা কঠোর আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। তেমনি নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রচলিত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ করা গেলে এমন অপরাধ কমে যাবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোনো নারী নির্যাতনের ঘটনায় আশেপাশে উপস্থিত মানুষ বা প্রতিবেশীদে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি নীরব দর্শকের ভূমিকায় না থাকে, তাহলে এমন অপরাধ সমাজে কমে যাবে।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: ভবন আছে, ডাক্তার আছে, সেবা নেই
খাতা-কলমে উন্নয়নের গল্প যতই শোনা যাক, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাগজে-কলমে দেশে ডাক্তার-নার্সের অভাব নেই, হাসপাতাল-ক্লিনিকেরও কমতি নেই। বড় বড় ভবন আছে, ঝকঝকে আধুনিক যন্ত্রপাতিও আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সেই সেবা পাচ্ছে? না, তা অধরাই থাকছে। কারণ, স্বাস্থ্যখাত প্রাতিষ্ঠানিক ‘লুটপাটের সংস্কৃতি’র কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। যা চিকিৎসা সেবার মতো মহান পেশাকেও ভয়ংকর এক পণ্যে পরিণত করেছে।

সরকারি হাসপাতালের গেট থেকে কাউন্টার—সর্বত্র ফাঁদের জাল
সরকারি হাসপাতালের গেট পেরোলেই রোগীকে ঘিরে ধরে দালালচক্র। যে দেশে ‘বিনামূল্যে চিকিৎসা’র কথা বলা হয়, সেখানে ট্রলি ঠেলতে কিংবা ওয়ার্ডে একটি সিট পেতেও গরিব মানুষকে টাকা গুনতে হয়। হাসপাতালে কেন্দ্র থেকে কোটি টাকার ওষুধ যায়, অথচ কাউন্টারে গিয়ে রোগী শুনে— ‘সাপ্লাই নেই’। সেই ওষুধই পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বিক্রি হয়ে যায়।

একজন রোগী যখন বাঁচার আশায় হাসপাতালে আসেন, তখন চিকিৎসার বদলে শুরু হয় ‘টেস্ট বাণিজ্য’। কোটি টাকার এমআরআই বা সিটি স্ক্যান মেশিন মাসের পর মাস প্যাকেটবন্দী পড়ে থাকে কিংবা নষ্ট হওয়ার অজুহাত দেখানো হয়—একটাই উদ্দেশ্যে: কমিশনভিত্তিক প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী পাঠানো। অকারণে ধরিয়ে দেওয়া হয় অপ্রয়োজনীয় টেস্টের লম্বা তালিকা। দিনশেষে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষ সর্বস্বান্ত হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবাটুকু পায় না। এমনকি ডিউটি রোস্টারে নাম থাকলেও অনেক সময় ডাক্তারের দেখা মেলে না।

সমস্যা ভবনে নয়—সমস্যা ব্যবস্থাপনায়
এই মুহূর্তে আমাদের নতুন হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। অপচয় করার মতো অর্থ রাষ্ট্রের নাই। সমস্যা ইট-পাথরের দালানে নয়; সমস্যা ব্যবস্থাপনায়, জবাবদিহিতার অভাবের। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন ভবন নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করাই সময়ের প্রধান দাবি।

অচলায়তন ভাঙার কঠোর সিদ্ধান্ত
এই অচলাবস্থা ভাঙতে আমরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চাই। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত কোনো ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। জনগণকে নিশ্চিত করতে চাই, দেশের সেরা স্পেশালিস্ট চিকিৎসকেরা দিনের কাজ শেষে সরকারি হাসপাতালেই বসে সরকার নির্ধারিত ভিজিট নিয়ে রোগী দেখার ব্যবস্থা করা হবে।

সরকারি সম্পদ লুটপাটের এই সংস্কৃতি আমরা ভেঙে ফেলতে চাই। আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ‘চিকিৎসা’ শব্দের অর্থ হবে সেবা নিশ্চিত করা।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: নিবেদিত শিক্ষক ছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষা অসম্ভব
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই সংস্কার প্রয়োজন। তবে যে খাতের সংকট আমাদের জাতির জন্য সবচেয়ে প্রকট, সেটি হলো শিক্ষাখাত। স্বাধীনতার পর থেকেই এই খাত চরমভাবে উপেক্ষিত। শিক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির করালগ্রাসে আজ আমাদের পুরো জ্ঞানঅর্জন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত।

স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতাসীনরা শিক্ষার উন্নয়ন বলতে মূলত নতুন অবকাঠামো নির্মাণকেই বুঝিয়েছে। বাজেটের পর বাজেট পাস হয়েছে, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনার সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে মূল প্রণোদনা ছিল দুর্নীতি করে অর্থবিত্ত বাড়ানো।

অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ— সব জায়গায় একই চিত্র। হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের বড় অংশ সুপারিশ, তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। আজ আমাদের শিক্ষাঙ্গনের দিকে তাকালেই শিক্ষার মানের ভয়াবহ অধঃপতন ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। এটি একদিনে হয়নি; যুগের পর যুগ রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর দুর্নীতির ফলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বৃত্তায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়— সবখানেই একই সংকট, শিক্ষকরা শিক্ষাদানে অনাগ্রহী। তারা নানা ধরনের অনিয়মে ব্যস্ত, কোচিং বাণিজ্যকে তারা মূল পেশায় পরিণত করেছে। সকল স্তরের শিক্ষকরা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও পক্ষে বিভক্ত হয়ে এমন অপকর্মে সময় নষ্ট করেন। গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন এখন আর তাদের লক্ষ্য নয়; বরং ক্ষমতাসীনদের আস্থাভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতাই তাদের অগ্রাধিকার।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের লক্ষ্য আরও বেশি সংখ্যায় ভবন ও অবকাঠামো গড়ে তোলা নয়; বরং একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষকদের দক্ষ, যোগ্য এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা যদি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাই, তাহলে বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে দেওয়া হবে। শিক্ষকদের বেতন, ভাতা ও সুবিধা বৃদ্ধি করে একে মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত করা হবে। তবে একই সঙ্গে তাদেরকে কঠোর তদারকির আওতায় নিয়ে আসা হবে। দায়িত্বশীল ও যোগ্য শিক্ষকদের পুরস্কৃত করা হবে, আর দায়িত্বে অবহেলাকারীদের তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।

আমাদের নতুন বন্দোবস্ত হবে এমন এক শিক্ষা সংস্কার, যেখানে উন্নয়ন মানে নতুন ভবন ও অবকাঠামো বাড়ানো নয়— বরং বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

কৃষি উন্নয়ন: কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ভিত্তি
সার, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থা সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের লুটেরা গোষ্ঠীর কারণে এসব উপকরণ অনেক সময় প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। আমরা নিশ্চিত করব যাতে কোনো সিন্ডিকেট বা লুটেরা গোষ্ঠী সার ও বীজ বাজারজাতকরণের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অধিক মূল্য আদায় করতে না পারে।

বাংলাদেশে কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো দুইটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত কৃষক-কৃষাণীদের কাছে এই ঋণ পৌঁছায় না। কৃষি ঋণ নিতে গেলে জমির দলিল, আইডি কার্ড ও নানা কাগজপত্রের নামে কৃষকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। ঋণের অর্থ পেতে কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়। এই জটিলতা ও অনিয়মের কারণে প্রকৃত কৃষক সমাজ কৃষি ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এনসিপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে, ঋণ প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রের নামে সব ধরনের হয়রানি ও অনিয়ম বন্ধ করা হবে। কৃষি ঋণ সহজলভ্য করা হবে, ইনশা আল্লাহ।

এদেশে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তারা নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। বাজারে যখন এক কেজি সবজির দাম আকাশছোঁয়া, তখন মাঠ পর্যায়ে কৃষক সেই একই পণ্য বিক্রি করছেন পানির দরে। সারের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর লাভের বদলে তাদের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপে। অনেক ক্ষেত্রে হতাশায় আক্রান্ত কৃষক কখনো কখনো নিজের ফসল নষ্ট করে ফেলতে বাধ্য হন। এটি শুধু ফসলের অপচয় নয়; এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য নিত্যপণ্য কেনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই অতিরিক্ত অর্থ কৃষক পাচ্ছেন না। মাঝপথ নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। একদিকে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে ভোক্তাকে উচ্চমূল্যের চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। আর মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা রাজনৈতিক টাউট, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর অসৎ সদস্য মুনাফা লুঠছে।

এই চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারকে জিম্মি করছে। মূল সমস্যা ত্রুটিপূর্ণ বিতরণ ব্যবস্থা, সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ না থাকায় কৃষকেরা এই ব্যবস্থার হাতে বন্দি। প্রান্তের ক্ষেত থেকে কেন্দ্রের বাজার পর্যন্ত দখল করে থাকা এই দুর্নীতির শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের মহোৎসব
আপনারা জানেন, গত বছর খুনি হাসিনার কুখ্যাত ‘দায়মুক্তি আইন’ বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো—আইন বাতিল হলেও সেই আইনের অধীনে করা ‘দাসত্বের চুক্তি’গুলো এখনো আমাদের অর্থনীতি ও জনগণের রক্ত চুষে যাচ্ছে। এখনো এই লুটেরাদের হাতে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৬৩ হাজার কোটি টাকা তুলে দিতে হচ্ছে।

খুনি হাসিনা সরকার চুক্তিগুলো এমনভাবে সাজিয়েছিল যেন বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও তার সমর্থক গোষ্ঠীর পকেট ভরতে থাকে। গত ১৮ মাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আইনি মারপ্যাঁচের কারণে সেই চক্র ভাঙা সম্ভব হয়নি। বছরের পর বছর দেশবিরোধী নীতি, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে জনগণের ওপর বোঝায় পরিণত করেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও এই বাটপারদের টাকা দিতে হয় রাষ্ট্রকে। লুটপাটের এই ব্যবস্থাকে ভদ্রভাষায় বলা হয় ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। মানে দেশ বিদ্যুৎ না কিনলেও কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করছে। প্রতিযোগিতা ছাড়া আদানি, সামিট, এস আলম, ইউনাইটেড, বসুন্ধরা, ওরিয়ন গ্রুপসহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী আরও কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে দেওলিয়া করে ফেলা হয়েছে।

আমরা স্পষ্ট বলতে চাই— জনগণের ট্যাক্সের টাকায় অনুৎপাদিত ও অব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য এই সকল গণশত্রুদের কোম্পানিকে আর কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। জনগণের স্বার্থবিরোধী সব অসম চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করাসহ জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে সিস্টেম লস কমানো হবে।

আমাদের বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলনের নামে বছরের পর বছর নাটক হয়েছে; আমরা সেই নাটকের ইতি টানতে চাই। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, সমুদ্রসীমানায় থাকা তেল-গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করব।

দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এনসিপির অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে

দেশে নির্বাচন এলেই বেকারদের নিয়ে নানা ধরনের তামাশা শুরু হয়। কেউ বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি দেয়, কেউ নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলে। কিন্তু বেকারত্বের মূল কারণ কী এবং কীভাবে এই সংকটের সহনীয় সমাধান সম্ভ, তা নিয়ে আলোচনা হয় না।

বাংলাদেশে বেকারত্বের প্রধান কারণ হলো জনশক্তির তুলনায় যথেষ্ট কর্মসংস্থানের অভাব। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, খুবই অবান্ধব বা বৈরি বিনিয়োগ নীতি ও আচরণ। ক্ষমতাসীন রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঘুষ ও ব্যক্তিগত ফায়দা ছাড়া বিনিয়োগে ব্যাপক বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে আটকে দেয়। শিল্প-কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে ও কাঁচামালের সংকট সৃষ্টি করে বিনিয়োগকারীদের বিমুখ করা হয়। ফলে নতুন শিল্প, কলকারখানা গড়ে ওঠে না। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করা। যাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে, যেকোনো বিনিয়োগ সহজতর হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান শিল্পখাতকে সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে একটিও শিল্পকারখানা বন্ধ না হয় এবং আরো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু বিদেশ যেতে মানুষকে জমি-জমা বা বাড়িঘর বিক্রি করে বিপুল অর্থের জোগান দিতে হয়। বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের খরচ ভারত, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় পাঁচ-ছয় গুণ বেশি। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দল ও আমলাদের সমর্থিত ভুল নীতি ও খুবই সক্রিয় একটি মাফিয়া চক্র। এরা কৃত্রিমভাবে ভিসা সংকট, অভিবাসনের পথে নানান জটিলতা এবং উড়োজাহাজ ভাড়াসহ পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে ইচ্ছামতো অর্থ আদায় করছে।

এনসিপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে এই দুষ্ট সিন্ডিকেট ভেঙে প্রবাসে যাওয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করা হবে। আমাদের লক্ষ্য— বিদেশে যেতে ইচ্ছুক মানুষ যেন স্বল্প সময়ে এবং কম খরচে নিরাপদভাবে বেরিয়ে যেতে পারে।

এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে আমরা দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সকল এনজিওকে আহ্বান জানাই, তারা যেন বিদেশগামী কর্মীদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ ঋণ প্রদানসহ অপরাপর বিষয়গুলোতে সহায়তা করে এই সকল গরিব মানুষের বিদেশযাত্রা সহজ করতে ভূমিকা রাখে। এমন সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে বেকার যে তরুণ-যুবকেরা প্রবাসে যেতে আগ্রহী, তাদের নিয়ে চলমান তামাশার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।

যোগাযোগ ও জনপরিবহন: নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিশৃঙ্খল খাত
যাতায়াত তথা জনপরিবহন ব্যবস্থাকে আমরা নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করি। দেশের বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা, যানজট ও অনিয়ম দূর করে একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চলাচলের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখা হবে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার অগ্রগণ্য হবে। জরুরি সেবা— বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিস পাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে না; সকলকে সাধারণ জনপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। মন্ত্রীদের কমপক্ষে সপ্তাহে এক দিন এবং সচিবদের কমপক্ষে সপ্তাহে দুই দিন জনপরিবহনে চলাচল করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীলদের জনজীবনের বাস্তবতা অনুভব করতে হবে— এটাই হবে সরকারের নতুন সাংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি।

আধুনিক বাস সার্ভিস চালুসহ অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিটি রুটে মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের সময় ও খরচের সাশ্রয় হয়। ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পরিবহনে বিশেষ ছাড় এবং সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে। যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত যানবাহন রাস্তা থেকে অপসারণ করা এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

পরিবহন খাতে অবৈধ চাঁদাবাজি ও কালোবাজারি কঠোর হাতে দমন করে ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করা হবে। টিকিটিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য ট্রেন ভ্রমণ সহজলভ্য হয়। বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে নিলামভিত্তিক অস্বচ্ছ ব্যবস্থা বন্ধ করা হবে।

আমাদের সমাজটাকে সুন্দর করে গড়তে হলে, সকল মানুষকে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও অন্যের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে সংবেদনশীল হতে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা, যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার করার সংস্কৃতি থেকে সমাজকে বের করে আনতে হবে। ট্রাফিক আইন সকলকে মেনে চলতে উৎসাহিত এবং রাস্তা, সড়ক মহাসড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে।

পরিশেষ
খুনি হাসিনার পতনের পর সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়নি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দলই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরেই থেকেছে। কিন্তু দুর্বৃত্তপরায়ণ একটি দলের নেতা, কর্মী ও সংগঠকরা, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা চাঁদাবাজি, দখল, নিয়োগ ও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি, মিথ্যা মামলা, বিচারের রায় কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও নির্যাতনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে ব্যাপক অর্থ লোপাট করেছে। যা ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে দেশবাসী দেখেছে।

নগদে প্রাপ্য এমন অভিজ্ঞতা থেকে এদেশের ভোটাররা বুঝে ফেলেছে, এই দলটি ক্ষমতায় গেলে তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র তছনছ করে ফেলবে। এই দুর্বৃত্তদের ওপর কোথাও কার কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দলটি বিজয়ী হলে, তা দেশবাসীর জন্য ভয়ংকর পরিণতি বয়ে নিয়ে আসবে।

আমি মনে করি, জনগণ তুলনামূলকভাবে ভালো একটি পক্ষ খুঁজে তাকে ভোট দেওয়ার গোপনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিদীপ্ত, সতাকাঙ্ক্ষী ও স্বপ্নবান মানুষ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সঙ্গোপনে এই মহান কর্মটি সম্পাদন করে ফেলবেন, ইনশা আল্লাহ।

দখলমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এনসিপির ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দিন: এক) অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ইন্ডিয়ার আধিপত্য থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। দুই) মানবাধিকার ও গণতন্ত্র হরণকারী ফ্যাসিবাদী শক্তির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয় থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে।

তিন) চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও দুর্নীতির থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। চার) স্বল্পশিক্ষিত, অযোগ্য, অসৎ, লোভী, বেপরোয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের প্রভাব থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে।

নিউজটি শেয়ার করুন

নির্বাচনে জয়ী হলে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে: নাহিদ ইসলাম

আপডেট সময় : ০৯:১০:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনে জয়ী হলে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। নিপীড়নের ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটন করা হবে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জাতির উদ্দেশে দেয়া নির্বাচনি ভাষণে এসব কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জোটে প্রার্থী নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বের দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেইনসাফি বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।

ভাষণে তিনি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে লুটপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি নতজানু অবস্থান পরিহার করে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতি গ্রহণের কথা বলেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ সবার সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও ছিল তার ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জননিরাপত্তার গণসংস্থায় রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

বিচার বিভাগ সংস্কার, শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা, নারীর সমঅধিকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে দুর্নীতি বন্ধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথাও বলেন এনসিপি আহ্বায়ক।

ভাষণের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রাখে, তবে বৈষম্য, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে— যেখানে রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে।

নাহিদ ইসলামের পুরো বক্তব্য হুবহু

সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ অভিমুখী ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর গত ৫৫ বছরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল এবং ক্ষমতাসীনদের সংস্পর্শে পৌঁছাতে পেরেছে, তারাই শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে গেছে।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান শর্ত। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থাতেও প্রভাবশালীদের জন্য অবৈধ ও বিশেষ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা রাজনীতিক, আমলা ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একটি চক্র রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ব্যাংক ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে, আর সাধারণ মানুষ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সংগ্রামেই ব্যস্ত থেকেছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে। পরিকল্পিতভাবে এই মহানগর ও তার আশপাশে বসবাসকারী দুই কোটি মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বড় বড় সব অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। আর এদের মাথার ওপর বসে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি ছোট্ট ধনীক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। যারা অসৎ উপায়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন হলে তা দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। গ্রাম, মফস্বল শহর ও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষিত জনদাবি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বেকার দুর্নীতিগ্রস্ত বেইনসাফের বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।

ফ্যাসিস্ট যুগে সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার হবে
দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সকল অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই এমন সকল সরকারি বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়েছে। তার এই অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পরে এর সবগুলোই ভেঙে পড়েছে। এতে নেতৃত্বপ্রদানকারী হোমড়া-চোমড়াদের কিছু লোক পালিয়েছে, কিছু বিচারের আওতায় এসেছে, অনেককে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। বহু সামরিক-বেসামরিক আমলা ও বিচারক এখনো কর্মে নিয়োজিত রয়েছে।

জুডিশিয়ারি, সিভিল সার্ভিস ও পুলিশ বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্ব ভেঙে পড়লেও ডিফেন্স সার্ভিস এখনও অটুট রয়েছে। তবে হাজার হাজার খুনি, লুটেরা, অপরাধীর সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া, সেখান থেকে নিরাপদে দেশান্তরিত হওয়া, কর্মস্থল থেকে কিছু জেনারেলের পালিয়ে যাওয়া, অবসরপ্রাপ্তদের বৈরিরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া, রিটায়ার্ড কিছু অফিসারের ব্যক্তিগত তথ্য জনসম্মুখে ফাঁস করে তাদের জব্দ করার সেনাগোয়েন্দাদের চেষ্টা জনসমাজে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক অমর্যাদা ঘটিয়েছে।

আমরা স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি— বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।

খুনি হাসিনাকে উৎখাত করার পর এই সকল অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মেজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নামানো হয়েছে। কিন্তু সুপিরিয়র কামান্ডের অনাগ্রহের কারণে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা, অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেফতারের মতো কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।

গুমবিষয়ক কমিশন ১,৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা তথ্য ও আলামত নষ্ট করে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরা অসহযোগিতা করেই চলেছে।

আমাদের লড়াই হবে সেই ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা, যা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সকল প্রবণতা সমাজ থেকে মুছে ফেলা।

ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার হবে
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট আওয়ামী ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে— যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার লুটপাটকৃত এই বিশাল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর কথা বললেও তাদের অবহেলা ও অজ্ঞতার কারনে এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত ফ্যাসিবাদী যুগের সুবিধাভোগী কিছু শীর্ষ আমলা ও বিশেষজ্ঞেরা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করায় এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার বিঘ্নিত হয়েছে।

দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। লুটপাট ও অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।

বিদেশে পাচারকৃত এদের যে অর্থ ইতিমধ্যে শনাক্ত হয়েছে তা বাংলাদেশের কর বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে জরিমানাসহ টেক্স বসিয়ে দেশে থাকা তাদের সমুদয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একই সঙ্গে চিহ্নিত লুটপাটকারীদের গণশত্রু ঘোষণা করে এদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট্র’-এর মালিকানায় নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাজীবীদের নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও স্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট কাঠামোর মাধ্যমে নবগঠিত এই সংস্থাটি পরিচালনা করা হবে।

আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।

পররাষ্ট্রনীতি: নতজানু কূটনীতি থেকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অবস্থান,
খুনি হাসিনার আমলে বাংলাদেশ একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আবদ্ধ ছিল। দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম কার্যত ইন্ডিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো, ফলে স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন কায়েম করা ও জারি রাখার সকল পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হতো দিল্লি থেকে। বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ফেলা, শাসন ব্যবস্থাকে গণবিরোধী করে তোলা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়ার সকল আয়োজন করা হয়েছে ইন্ডিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী।

বছরের পর বছর ধরে, সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে ইন্ডিয়ার খুনে বাহিনী বিএসএফ শত শত বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করলেও খুনি হাসিনার সরকার চুপ করে থেকেছে। ফ্যাসিবাদী যুগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট সচিবগণ এবং বিজিবির মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসাররা ইন্ডিয়ার এই অসভ্য মানবতাবিরোধী আচরণের পক্ষে সাফাই গেয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। পৃথিবীর শত্রুভাবাপন্ন ও যুদ্ধরত দেশের সীমান্তেও এভাবে বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করে খুন করার নজির নেই।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’— এই স্লোগান আওড়ালেও বাস্তবে খুনি হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ইন্ডিয়ার নির্দেশ পালন করা। সে কারণে পাকিস্তানের প্রতি সর্বক্ষেত্রে বৈরি আচরণ করা হতো। বাস্তবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ইন্ডিয়ার পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল তারা। তখন ঢাকার এই ফ্যাসিস্ট শাসকরা মনে করত দিল্লি তাদের ঔপনেবেশিক শাসনের কেন্দ্র। সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল তাতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারো ওপর অতি নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়াতে সার্ক পুনরোজ্জিবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাব।

প্রবাসে থাকা নাগরিকদের সমস্যা সমাধান ও দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল প্রান্তে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করা এবং কূটনীতিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। লক্ষ্য হবে, পৃথিবীর সম্ভাবনাময় সকল দেশে নামমাত্র খরচে জনবল রপ্তানি করা এবং তারা যাতে কোথাও কোনোভাবে হেনস্থার শিকার না হয়, সেই সুরক্ষা দেওয়া। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

গণপ্রতিরোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুব-সমাজ সমর্থিত উচ্চপ্রযুক্তি নির্ভর সশস্ত্রবাহিনী,
খুনি হাসিনা তার শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে দলীয় স্বার্থে নিজ দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এর ফলে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কার্যত দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। যখন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট তৈরির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা এখনো তৃতীয় প্রজন্মের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছি।

বর্তমান কাঠামোতে ডিফেন্স বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য একটি অকার্যকর ও অস্থিতিশীল ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতকে কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী করতে হলে এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।

আমরা যদি সরকার গঠন করতে পারি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করব। আমাদের লক্ষ্য হবে বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং গুণগত মান বৃদ্ধি করা। পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাই-টেক বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে।

একই সঙ্গে দেশের সকল ১৮ ঊর্ধ্ব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলেটারি ট্রেনিং চালু করা হবে, এতে দেশব্যাপী জনভিত্তি সম্পন্ন এক গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফলে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমবে।

দ্রব্যমূল্য: ন্যায্য বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে স্বস্তি ফেরাবো
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য মূল্যে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যে মানুষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের ভূমিকা হবে সক্রিয়ভাবে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের মূল্য সবসময়ই সর্বাধিক। এর কারণ, এদেশে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করে। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। এমন দুষ্টু চক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি প্রমাণিত হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।

কৃষকরা যাতে তাদের শস্য ও কৃষিপণ্য কাউকে কোনো চাঁদা বা তোলা না দিয়ে বিক্রি করতে পারে এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদেরকেও যেন কাউকে কোথাও এক টাকাও না দিতে হয়, সরকার তা নিশ্চিত করবে। কঠোরভাবে এই পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করা গেলে, বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অযৌক্তিকভাবে সারাদেশে সাধারণ মানুষকে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। সরকার ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা এবং ওএমএস কর্মসূচি বিস্তৃত করবে। যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সহজে সুলভে পণ্য কিনতে পারে।

প্রতিবেশী বৃহৎ দেশটির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো হবে যাতে কেউ আমাদের পণ্যবন্দি করে বিপদে ফেলতে না পারে।

বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাদের সহজলভ্য ঋণ ও সরকারি সমর্থন দেওয়া হবে। কাঁচাপণ্য সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের জন্য ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবহন ও এর ব্যয় ন্যায়সঙ্গত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মৌসুমি পণ্যের জন্য সরকারিভাবে আগাম পরিকল্পনা করে মাল কিনে তা মজুত করা হবে। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট— একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা: দলীয় বাহিনী ভেঙে জননিরাপত্তার গণসংস্থা
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী কার্যত একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মতো পুলিশকেও ‘পুলিশলীগ’ নামে ডাকতে শুরু করেছিল। দেশে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা তখনকার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়নি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও পুলিশ ব্যাপক নৃশংসতা করেছে। আমরা সরকার গঠন করলে, জুলাই বিপ্লবের সময় এবং এর পূর্বাপর ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি করে অর্থ লোপাট ও ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল— তাদের প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় আনা হবে।

এমন সকল বিচার সম্পন্ন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশকে খোলনলচে বদলে পুনর্গঠন করা হবে। দেশ ও জনগণের সেবা হবে পুলিশের একমাত্র মন্ত্র। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় সংকীর্ণ মনোভাবের সংস্কৃতিকে কবর দিয়ে বাহিনীকে জন নিরাপত্তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা নিম্নলিখিত দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করব:

প্রথমত, দেশবাসীর মতামত নিয়ে, ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন ও নানান জুলুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহনী’ বা অন্যকিছু রাখা হবে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানেই পদায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সমান সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে।

বিচার বিভাগ: অন্যায়ের গোলকধাঁধা ভাঙবে কীভাবে,
বাংলাদেশে বিচার চাওয়া আজ দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং অনেক সময় হতাশাজনক এক যাত্রা। একজন মজলুম মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান, তখন তিনি শুধু একজন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়— একটি জটিল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। থানায় মামলা নিতে অনীহা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে তারিখের পর তারিখ পড়া এবং ব্যাপক অর্থ ব্যয়ের চাপ— সব মিলিয়ে বিচার এদেশে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।

আর ঘুষ? আদালতের দরজায় পা রাখলেই যেন শুরু হয় অবৈধ লেনদেন। নথি নড়াতে টাকা, তারিখ পেতে টাকা, আদেশ পেতে টাকা— ঘুষের বাজারের মহা হই-হুল্লোরের মধ্যে বিচারের বাণী স্তব্ধ হয়ে গেছে! ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য বলছে, বিচার নিতে গিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। সরকারের লিগ্যাল এইড আইন অনুযায়ী গরিব ও মজলুম মানুষের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও এর কোনো সুবিধা নিচে পড়ে থাকা মানুষ পায় না। বাস্তবে বিচারক, উকিল, মোক্তার ও দালালচক্রের এক জালে সাধারণ মানুষ আটকে যায়, দিশাহীন চক্রে ঘুরপাক খায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার চাওয়া বিচারপ্রার্থীদের জন্য শাস্তি ও ভোগান্তি হিসেবে হাজির হয়। বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে অর্থবিত্ত, সময়, শারিরীক সামর্থ এবং জীবনের স্বপ্নও হারিয়ে যায়। ধীরে চলা বিচার অন্যায় ও অবিচারকে বলশালী করে তোলে।

আজ বিচার ব্যবস্থা রাজনীতিক প্রভাব, অর্থশক্তি ও সুবিধাবাদী চক্রের মাধ্যমে কলুষিত। জেলা আদালত থেকে সর্বোচ্চ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত একই অন্ধকারের ছায়া আমরা দেখেছি, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এটা আরও বিস্তৃত ও অধঃপতিত হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, তাদের ইচ্ছামতো রায়ও জুটে, বিরোধীদলে যারা থাকেন তাদের মামলা বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে।

ভয়ংকর এই অশুভ চর্চার কারণে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়েছে। এরা তাদের সকল গৌরব, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত সকল স্তরে ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগ করে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিচারকের সংখ্যা বহুগুণে বাড়াতে হবে, পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে, ঘুষ দুর্নীতি নির্ভর রায় বেচা-কেনার চলমান আয়োজন ভেঙে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই এনসিপির অঙ্গীকার।

শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ: কেন্দ্র ভেঙে ক্ষমতা ছড়িয়ে দেব প্রান্তে,
বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো এখনও ব্রিটিশ ঔপনিবেশ সৃষ্ট পুরোনো মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ক্ষমতা ভয়াবহভাবে কেন্দ্রীভূত। দেশের প্রচলিত শাসন সংস্কৃতিতে রাজনীতিক, আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাকে ধরে রাখছে। ফলে ঢাকার অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয় না, যা উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত করে এবং জনগণের প্রয়োজন উপেক্ষিত থাকে।

খাদ্য, কৃষি, বস্ত্র, গৃহায়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকল্যাণ, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নারী-শিশু উন্নয়ন এবং স্থানীয় অবকাঠামোগত সেবার মতো অধিকাংশ দায়িত্ব উপজেলা পর্যায়ে হস্তান্তর করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি কমবে, স্থানীয় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসূচী নেওয়া ও তা বাস্তবায়ন হবে এবং জনগণ সেবা পাবে। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় অবকাঠামোর মতো বড় বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। অন্যদিকে উপজেলা ও পৌর প্রশাসন জনগণের দৈনন্দিন সেবা নিশ্চিত করবে, এমনটিই উন্নত দেশগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে চালু আছে।

বিচার ব্যবস্থার জট কমাতে উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ও আয়োজন করা হবে, যাতে ছোটখাটো বিরোধে স্থানীয়ভাবেই দ্রুত সমাধান পায়। একইভাবে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি জননিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে নাগরিকদের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা যায়।

জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। প্রতিটি স্তরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। যেকোনো পর্যায়ের স্থানীয় সরকারে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক-পাস যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হবে।

শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
ভেজাল ছাড়া কোনো খাদ্যপণ্য নাই: এই অপরাধ চলতে দেয়া হবে না

বর্তমানে দেশে এমন কোনো খাদ্যপণ্য পাওয়া কঠিন যা ভেজালমুক্ত। দীর্ঘমেয়াদে এই ভেজাল নানান জটিল রোগ সৃষ্টি করছে, মানুষের সুস্থতা ও আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করছে। যদিও দেশে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন রয়েছে, বাস্তবে বিশাল এই ভেজালের সাম্রাজ্যের ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্বে থাকলেও ঘুষ ও দুর্নীতির বিনিময়ে তারা চোখ-কান বন্ধ করে রাখে।

ভেজাল কারবারের এই সাম্রাজ্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যাদের বিরুদ্ধে আইন-কানুন প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই অবস্থার অবসান ঘটাতেই হবে। জনগণের সুস্বাস্থ্য রক্ষার যে অধিকার তার সঙ্গে আপোষ করা যাবে না। ব্যবসা করা অপরাধ নয়, কিন্তু সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্যের গুণগত মান শতভাগ নিশ্চিত না করলে অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

আমাদের কার্যকর পদক্ষেপসমূহ

• ভেজালকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা

• বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ড নিশ্চিত করা

• ভেজালকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া

• বাজার, আড়ত, কারখানা ও আমদানিকৃত খাদ্যে নিয়মিত র‌্যান্ডম টেস্টিং চালু করা

• BSTI ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা

• জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল ফুড টেস্টিং ল্যাব চালু করা

• ভেজাল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা

• ভোক্তাদের জন্য কার্যকর হটলাইন ও অভিযোগ অ্যাপ চালু করা

• নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের জন্য স্বীকৃতি ও প্রণোদনা প্রদান

• ভেজালের বিরুদ্ধে তথ্য দিলে নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা

• অভিযান ও পরিদর্শনে জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— জনগণের খাদ্য নিরাপত্তাকে আপসহীন অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ভেজালের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি প্রয়োগ করা।

ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর সংস্কৃতি ও নিজস্বতার প্রতি শ্রদ্ধা
আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় বিভাজনের কারণ না হয়ে এর ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, সহাবস্থান ও স্বাধীনতা। আমাদের লক্ষ্য একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, যেখানে নাগরিকের সমঅধিকার তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও পরিচয়ের উর্ধ্বে স্থান পাবে।

সকল ধর্ম ও জাতিগত গোষ্ঠীর সমান নিরাপত্তা: সংখ্যালঘু হলেও কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা সহিংসতার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ থাকবে, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কোনো বিভেদ ও বৈষম্য মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের স্বপ্ন এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা যেখানে মানুষকে তার ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ে নয়, বরং মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করা হবে।

ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা: বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে। অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতা নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সকলের সহাবস্থান থাকবে। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।

পোশাকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: প্রত্যেক নাগরিক নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন। একজন ধর্মবিশ্বাসী নারী যেমন হিজাব বা বোরকা পরতে পারবেন, তেমনি অন্য সকলে যেভাবে আধুনিক পোশাক পরেন, তা পরিধানের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দই অগ্রগন্য হবে। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ জীবনধারা আরোপ করবে না; ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

ভয় ছড়ানোর অপরাজনীতি মোকাবিলা: দেশটা ‘চরমপন্থায় চলে যাচ্ছে’ বলে একটি মহল আজ আবার নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। দেশবাসী ভুলে যায়নি, ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন চালু ছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ছিটকে পড়া কায়েমি স্বার্থবাদী মহল অচল হয়ে যাওয়া সেই সকল কথা নতুন মোড়কে উপস্থাপন করছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সমাজ সহনশীল ও বহুত্ববাদী; এই ঐতিহ্যকে আরও বলবান করা হবে।

ঘৃণাবিরোধী নীতি ও সামাজিক সম্প্রীতি: ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত ঘৃণা বা উস্কানিমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও গণমাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহনশীলতার মূল্যবোধ প্রচার করা হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের সম্মিলিত ঐতিহ্যের অংশ। রাষ্ট্র এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখবে এবং সাংস্কৃতিক চর্চা ও পরিচয় সংরক্ষণে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেখানে সংখ্যালঘু মুসলমানরা প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হন এবং তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদরাসা ধ্বংসের ঘটনা ঘটে, সেখানে বাংলাদেশে উস্কানীমূলক পরিস্থিতিতেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দির রক্ষায় এগিয়ে যায় মুসলমানরা। আমরা সরকার গঠনের সুযোগ পেলে, সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। সকল ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।

নারী প্রশ্ন: সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলবে
নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করাই হবে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। আমরা বিশ্বাস করি, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাঙ্গন, যানবাহন, জনসমাগমস্থল, এমনকি ঘরের ভেতরেও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরি, রাজনীতি, জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারসহ সকল পর্যায়ে নারীদের যৌক্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত করা হবে।

গৃহস্থলে সহিংসতা, যৌন হয়রানীসহ সকল ধরনের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। অতীতের অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে, সরকার অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ভয়ংকর ঘটনা কঠোর আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। তেমনি নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রচলিত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ করা গেলে এমন অপরাধ কমে যাবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোনো নারী নির্যাতনের ঘটনায় আশেপাশে উপস্থিত মানুষ বা প্রতিবেশীদে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি নীরব দর্শকের ভূমিকায় না থাকে, তাহলে এমন অপরাধ সমাজে কমে যাবে।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: ভবন আছে, ডাক্তার আছে, সেবা নেই
খাতা-কলমে উন্নয়নের গল্প যতই শোনা যাক, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাগজে-কলমে দেশে ডাক্তার-নার্সের অভাব নেই, হাসপাতাল-ক্লিনিকেরও কমতি নেই। বড় বড় ভবন আছে, ঝকঝকে আধুনিক যন্ত্রপাতিও আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সেই সেবা পাচ্ছে? না, তা অধরাই থাকছে। কারণ, স্বাস্থ্যখাত প্রাতিষ্ঠানিক ‘লুটপাটের সংস্কৃতি’র কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। যা চিকিৎসা সেবার মতো মহান পেশাকেও ভয়ংকর এক পণ্যে পরিণত করেছে।

সরকারি হাসপাতালের গেট থেকে কাউন্টার—সর্বত্র ফাঁদের জাল
সরকারি হাসপাতালের গেট পেরোলেই রোগীকে ঘিরে ধরে দালালচক্র। যে দেশে ‘বিনামূল্যে চিকিৎসা’র কথা বলা হয়, সেখানে ট্রলি ঠেলতে কিংবা ওয়ার্ডে একটি সিট পেতেও গরিব মানুষকে টাকা গুনতে হয়। হাসপাতালে কেন্দ্র থেকে কোটি টাকার ওষুধ যায়, অথচ কাউন্টারে গিয়ে রোগী শুনে— ‘সাপ্লাই নেই’। সেই ওষুধই পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বিক্রি হয়ে যায়।

একজন রোগী যখন বাঁচার আশায় হাসপাতালে আসেন, তখন চিকিৎসার বদলে শুরু হয় ‘টেস্ট বাণিজ্য’। কোটি টাকার এমআরআই বা সিটি স্ক্যান মেশিন মাসের পর মাস প্যাকেটবন্দী পড়ে থাকে কিংবা নষ্ট হওয়ার অজুহাত দেখানো হয়—একটাই উদ্দেশ্যে: কমিশনভিত্তিক প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী পাঠানো। অকারণে ধরিয়ে দেওয়া হয় অপ্রয়োজনীয় টেস্টের লম্বা তালিকা। দিনশেষে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষ সর্বস্বান্ত হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবাটুকু পায় না। এমনকি ডিউটি রোস্টারে নাম থাকলেও অনেক সময় ডাক্তারের দেখা মেলে না।

সমস্যা ভবনে নয়—সমস্যা ব্যবস্থাপনায়
এই মুহূর্তে আমাদের নতুন হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। অপচয় করার মতো অর্থ রাষ্ট্রের নাই। সমস্যা ইট-পাথরের দালানে নয়; সমস্যা ব্যবস্থাপনায়, জবাবদিহিতার অভাবের। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন ভবন নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করাই সময়ের প্রধান দাবি।

অচলায়তন ভাঙার কঠোর সিদ্ধান্ত
এই অচলাবস্থা ভাঙতে আমরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চাই। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত কোনো ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। জনগণকে নিশ্চিত করতে চাই, দেশের সেরা স্পেশালিস্ট চিকিৎসকেরা দিনের কাজ শেষে সরকারি হাসপাতালেই বসে সরকার নির্ধারিত ভিজিট নিয়ে রোগী দেখার ব্যবস্থা করা হবে।

সরকারি সম্পদ লুটপাটের এই সংস্কৃতি আমরা ভেঙে ফেলতে চাই। আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ‘চিকিৎসা’ শব্দের অর্থ হবে সেবা নিশ্চিত করা।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: নিবেদিত শিক্ষক ছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষা অসম্ভব
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই সংস্কার প্রয়োজন। তবে যে খাতের সংকট আমাদের জাতির জন্য সবচেয়ে প্রকট, সেটি হলো শিক্ষাখাত। স্বাধীনতার পর থেকেই এই খাত চরমভাবে উপেক্ষিত। শিক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির করালগ্রাসে আজ আমাদের পুরো জ্ঞানঅর্জন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত।

স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতাসীনরা শিক্ষার উন্নয়ন বলতে মূলত নতুন অবকাঠামো নির্মাণকেই বুঝিয়েছে। বাজেটের পর বাজেট পাস হয়েছে, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনার সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে মূল প্রণোদনা ছিল দুর্নীতি করে অর্থবিত্ত বাড়ানো।

অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ— সব জায়গায় একই চিত্র। হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের বড় অংশ সুপারিশ, তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। আজ আমাদের শিক্ষাঙ্গনের দিকে তাকালেই শিক্ষার মানের ভয়াবহ অধঃপতন ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। এটি একদিনে হয়নি; যুগের পর যুগ রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর দুর্নীতির ফলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বৃত্তায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়— সবখানেই একই সংকট, শিক্ষকরা শিক্ষাদানে অনাগ্রহী। তারা নানা ধরনের অনিয়মে ব্যস্ত, কোচিং বাণিজ্যকে তারা মূল পেশায় পরিণত করেছে। সকল স্তরের শিক্ষকরা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও পক্ষে বিভক্ত হয়ে এমন অপকর্মে সময় নষ্ট করেন। গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন এখন আর তাদের লক্ষ্য নয়; বরং ক্ষমতাসীনদের আস্থাভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতাই তাদের অগ্রাধিকার।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের লক্ষ্য আরও বেশি সংখ্যায় ভবন ও অবকাঠামো গড়ে তোলা নয়; বরং একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষকদের দক্ষ, যোগ্য এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা যদি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাই, তাহলে বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে দেওয়া হবে। শিক্ষকদের বেতন, ভাতা ও সুবিধা বৃদ্ধি করে একে মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত করা হবে। তবে একই সঙ্গে তাদেরকে কঠোর তদারকির আওতায় নিয়ে আসা হবে। দায়িত্বশীল ও যোগ্য শিক্ষকদের পুরস্কৃত করা হবে, আর দায়িত্বে অবহেলাকারীদের তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।

আমাদের নতুন বন্দোবস্ত হবে এমন এক শিক্ষা সংস্কার, যেখানে উন্নয়ন মানে নতুন ভবন ও অবকাঠামো বাড়ানো নয়— বরং বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

কৃষি উন্নয়ন: কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ভিত্তি
সার, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থা সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের লুটেরা গোষ্ঠীর কারণে এসব উপকরণ অনেক সময় প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। আমরা নিশ্চিত করব যাতে কোনো সিন্ডিকেট বা লুটেরা গোষ্ঠী সার ও বীজ বাজারজাতকরণের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অধিক মূল্য আদায় করতে না পারে।

বাংলাদেশে কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো দুইটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত কৃষক-কৃষাণীদের কাছে এই ঋণ পৌঁছায় না। কৃষি ঋণ নিতে গেলে জমির দলিল, আইডি কার্ড ও নানা কাগজপত্রের নামে কৃষকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। ঋণের অর্থ পেতে কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়। এই জটিলতা ও অনিয়মের কারণে প্রকৃত কৃষক সমাজ কৃষি ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এনসিপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে, ঋণ প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রের নামে সব ধরনের হয়রানি ও অনিয়ম বন্ধ করা হবে। কৃষি ঋণ সহজলভ্য করা হবে, ইনশা আল্লাহ।

এদেশে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তারা নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। বাজারে যখন এক কেজি সবজির দাম আকাশছোঁয়া, তখন মাঠ পর্যায়ে কৃষক সেই একই পণ্য বিক্রি করছেন পানির দরে। সারের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর লাভের বদলে তাদের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপে। অনেক ক্ষেত্রে হতাশায় আক্রান্ত কৃষক কখনো কখনো নিজের ফসল নষ্ট করে ফেলতে বাধ্য হন। এটি শুধু ফসলের অপচয় নয়; এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য নিত্যপণ্য কেনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই অতিরিক্ত অর্থ কৃষক পাচ্ছেন না। মাঝপথ নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। একদিকে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে ভোক্তাকে উচ্চমূল্যের চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। আর মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা রাজনৈতিক টাউট, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর অসৎ সদস্য মুনাফা লুঠছে।

এই চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারকে জিম্মি করছে। মূল সমস্যা ত্রুটিপূর্ণ বিতরণ ব্যবস্থা, সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ না থাকায় কৃষকেরা এই ব্যবস্থার হাতে বন্দি। প্রান্তের ক্ষেত থেকে কেন্দ্রের বাজার পর্যন্ত দখল করে থাকা এই দুর্নীতির শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের মহোৎসব
আপনারা জানেন, গত বছর খুনি হাসিনার কুখ্যাত ‘দায়মুক্তি আইন’ বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো—আইন বাতিল হলেও সেই আইনের অধীনে করা ‘দাসত্বের চুক্তি’গুলো এখনো আমাদের অর্থনীতি ও জনগণের রক্ত চুষে যাচ্ছে। এখনো এই লুটেরাদের হাতে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৬৩ হাজার কোটি টাকা তুলে দিতে হচ্ছে।

খুনি হাসিনা সরকার চুক্তিগুলো এমনভাবে সাজিয়েছিল যেন বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও তার সমর্থক গোষ্ঠীর পকেট ভরতে থাকে। গত ১৮ মাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আইনি মারপ্যাঁচের কারণে সেই চক্র ভাঙা সম্ভব হয়নি। বছরের পর বছর দেশবিরোধী নীতি, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে জনগণের ওপর বোঝায় পরিণত করেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও এই বাটপারদের টাকা দিতে হয় রাষ্ট্রকে। লুটপাটের এই ব্যবস্থাকে ভদ্রভাষায় বলা হয় ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। মানে দেশ বিদ্যুৎ না কিনলেও কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করছে। প্রতিযোগিতা ছাড়া আদানি, সামিট, এস আলম, ইউনাইটেড, বসুন্ধরা, ওরিয়ন গ্রুপসহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী আরও কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে দেওলিয়া করে ফেলা হয়েছে।

আমরা স্পষ্ট বলতে চাই— জনগণের ট্যাক্সের টাকায় অনুৎপাদিত ও অব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য এই সকল গণশত্রুদের কোম্পানিকে আর কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। জনগণের স্বার্থবিরোধী সব অসম চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করাসহ জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে সিস্টেম লস কমানো হবে।

আমাদের বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলনের নামে বছরের পর বছর নাটক হয়েছে; আমরা সেই নাটকের ইতি টানতে চাই। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, সমুদ্রসীমানায় থাকা তেল-গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করব।

দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এনসিপির অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে

দেশে নির্বাচন এলেই বেকারদের নিয়ে নানা ধরনের তামাশা শুরু হয়। কেউ বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি দেয়, কেউ নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলে। কিন্তু বেকারত্বের মূল কারণ কী এবং কীভাবে এই সংকটের সহনীয় সমাধান সম্ভ, তা নিয়ে আলোচনা হয় না।

বাংলাদেশে বেকারত্বের প্রধান কারণ হলো জনশক্তির তুলনায় যথেষ্ট কর্মসংস্থানের অভাব। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, খুবই অবান্ধব বা বৈরি বিনিয়োগ নীতি ও আচরণ। ক্ষমতাসীন রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঘুষ ও ব্যক্তিগত ফায়দা ছাড়া বিনিয়োগে ব্যাপক বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে আটকে দেয়। শিল্প-কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে ও কাঁচামালের সংকট সৃষ্টি করে বিনিয়োগকারীদের বিমুখ করা হয়। ফলে নতুন শিল্প, কলকারখানা গড়ে ওঠে না। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করা। যাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে, যেকোনো বিনিয়োগ সহজতর হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান শিল্পখাতকে সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে একটিও শিল্পকারখানা বন্ধ না হয় এবং আরো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু বিদেশ যেতে মানুষকে জমি-জমা বা বাড়িঘর বিক্রি করে বিপুল অর্থের জোগান দিতে হয়। বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের খরচ ভারত, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় পাঁচ-ছয় গুণ বেশি। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দল ও আমলাদের সমর্থিত ভুল নীতি ও খুবই সক্রিয় একটি মাফিয়া চক্র। এরা কৃত্রিমভাবে ভিসা সংকট, অভিবাসনের পথে নানান জটিলতা এবং উড়োজাহাজ ভাড়াসহ পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে ইচ্ছামতো অর্থ আদায় করছে।

এনসিপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে এই দুষ্ট সিন্ডিকেট ভেঙে প্রবাসে যাওয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করা হবে। আমাদের লক্ষ্য— বিদেশে যেতে ইচ্ছুক মানুষ যেন স্বল্প সময়ে এবং কম খরচে নিরাপদভাবে বেরিয়ে যেতে পারে।

এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে আমরা দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সকল এনজিওকে আহ্বান জানাই, তারা যেন বিদেশগামী কর্মীদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ ঋণ প্রদানসহ অপরাপর বিষয়গুলোতে সহায়তা করে এই সকল গরিব মানুষের বিদেশযাত্রা সহজ করতে ভূমিকা রাখে। এমন সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে বেকার যে তরুণ-যুবকেরা প্রবাসে যেতে আগ্রহী, তাদের নিয়ে চলমান তামাশার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।

যোগাযোগ ও জনপরিবহন: নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিশৃঙ্খল খাত
যাতায়াত তথা জনপরিবহন ব্যবস্থাকে আমরা নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করি। দেশের বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা, যানজট ও অনিয়ম দূর করে একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চলাচলের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখা হবে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার অগ্রগণ্য হবে। জরুরি সেবা— বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিস পাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে না; সকলকে সাধারণ জনপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। মন্ত্রীদের কমপক্ষে সপ্তাহে এক দিন এবং সচিবদের কমপক্ষে সপ্তাহে দুই দিন জনপরিবহনে চলাচল করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীলদের জনজীবনের বাস্তবতা অনুভব করতে হবে— এটাই হবে সরকারের নতুন সাংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি।

আধুনিক বাস সার্ভিস চালুসহ অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিটি রুটে মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের সময় ও খরচের সাশ্রয় হয়। ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পরিবহনে বিশেষ ছাড় এবং সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে। যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত যানবাহন রাস্তা থেকে অপসারণ করা এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

পরিবহন খাতে অবৈধ চাঁদাবাজি ও কালোবাজারি কঠোর হাতে দমন করে ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করা হবে। টিকিটিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য ট্রেন ভ্রমণ সহজলভ্য হয়। বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে নিলামভিত্তিক অস্বচ্ছ ব্যবস্থা বন্ধ করা হবে।

আমাদের সমাজটাকে সুন্দর করে গড়তে হলে, সকল মানুষকে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও অন্যের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে সংবেদনশীল হতে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা, যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার করার সংস্কৃতি থেকে সমাজকে বের করে আনতে হবে। ট্রাফিক আইন সকলকে মেনে চলতে উৎসাহিত এবং রাস্তা, সড়ক মহাসড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে।

পরিশেষ
খুনি হাসিনার পতনের পর সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়নি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দলই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরেই থেকেছে। কিন্তু দুর্বৃত্তপরায়ণ একটি দলের নেতা, কর্মী ও সংগঠকরা, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা চাঁদাবাজি, দখল, নিয়োগ ও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি, মিথ্যা মামলা, বিচারের রায় কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও নির্যাতনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে ব্যাপক অর্থ লোপাট করেছে। যা ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে দেশবাসী দেখেছে।

নগদে প্রাপ্য এমন অভিজ্ঞতা থেকে এদেশের ভোটাররা বুঝে ফেলেছে, এই দলটি ক্ষমতায় গেলে তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র তছনছ করে ফেলবে। এই দুর্বৃত্তদের ওপর কোথাও কার কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দলটি বিজয়ী হলে, তা দেশবাসীর জন্য ভয়ংকর পরিণতি বয়ে নিয়ে আসবে।

আমি মনে করি, জনগণ তুলনামূলকভাবে ভালো একটি পক্ষ খুঁজে তাকে ভোট দেওয়ার গোপনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিদীপ্ত, সতাকাঙ্ক্ষী ও স্বপ্নবান মানুষ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সঙ্গোপনে এই মহান কর্মটি সম্পাদন করে ফেলবেন, ইনশা আল্লাহ।

দখলমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এনসিপির ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দিন: এক) অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ইন্ডিয়ার আধিপত্য থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। দুই) মানবাধিকার ও গণতন্ত্র হরণকারী ফ্যাসিবাদী শক্তির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয় থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে।

তিন) চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও দুর্নীতির থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। চার) স্বল্পশিক্ষিত, অযোগ্য, অসৎ, লোভী, বেপরোয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের প্রভাব থেকে দখলমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে।