ঢাকা ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদের হিসাবে এত গড়মিল কেন?

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:১৭:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬ ১৩৬ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নির্বাচন এলেই আলোচনায় আসে প্রার্থীদের দেয়া সম্পদের হিসাব বা হলফনামা (Election Affidavit)। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামায় সম্পদের অর্জিত মূল্য এবং বর্তমান বাজারমূল্যের (Market Value vs Acquisition Cost) মধ্যে বিশাল পার্থক্য নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি হলফনামায় মাত্র কয়েক লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

হলফনামার নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থীকে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ‘অর্জিত মূল্য’ বা কেনার সময়কার দাম উল্লেখ করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission – EC) ফরম্যাটে বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা না থাকায় প্রার্থীরা তাদের কয়েক দশক আগে কেনা জমির দাম সেই সময়ের হিসেবেই দেখাচ্ছেন। ফলে রাজধানীর অভিজাত এলাকার শতকোটি টাকার জমি হলফনামায় মাত্র কয়েক হাজার টাকা হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (SHUJAN) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে হলফনামায় বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ না করায় প্রার্থীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এটি মূলত সম্পদের তথ্য গোপনের (Hiding Assets Information) একটি আইনি ফাঁক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভোটাররা অভিযোগ করছেন যে, হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। একজন প্রার্থী ১০ বছর আগে যে সম্পদ দেখিয়েছেন, বর্তমানে তার মূল্য শতগুণ বাড়লেও কাগজে-কলমে তা অপরিবর্তিত থাকছে। এই তথ্যের অসঙ্গতি নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা (Electoral Transparency and Accountability) নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে যেকোনো প্রার্থীর হলফনামা (Affidavit) সরাসরি দেখা ও ডাউনলোড করা যায়। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ecs.gov.bd অথবা সরাসরি Affidavit Portal-এ প্রবেশ করুন।

ধাপ ২: মেনু থেকে ‘নির্বাচনি ফলাফল’ বা ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অপশনটি বেছে নিন।

ধাপ ৩: সেখানে ‘প্রার্থীগণের হলফনামা’ নামে একটি লিঙ্ক পাবেন। এতে ক্লিক করলে একটি নতুন পেজ ওপেন হবে।

ধাপ ৪: এরপর নির্দিষ্ট সংসদীয় আসন (যেমন: ঢাকা-১০) অথবা প্রার্থীর নাম লিখে সার্চ করুন।

ধাপ ৫: প্রার্থীর নামের পাশে থাকা ‘হলফনামা’ বা ‘Affidavit’ বাটনে ক্লিক করলে স্ক্যান করা পিডিএফ ফাইলটি দেখতে পাবেন।

প্রো-টিপ: টিআইবি (TIB)-র ‘Know Your Candidate (KYC)’ ড্যাশবোর্ড (ti-bangladesh.org/kyc) ব্যবহার করে আপনি প্রার্থীদের বিগত কয়েক বছরের সম্পদের তুলনামূলক চিত্র সহজেই দেখতে পারেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী হলফনামায় তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দেয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এর আইনগুলো হলো:

প্রার্থিতা বাতিল: যাচাই-বাছাইয়ের (Scrutiny) সময় যদি রিটার্নিং কর্মকর্তা নিশ্চিত হন যে কোনো প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারেন।

নির্বাচিত হওয়ার পরও পদচ্যুতি: কোনো প্রার্থী মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি তা প্রমাণিত হয়, তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার সংসদ সদস্য পদ (Membership) বাতিল হতে পারে।

কারাদণ্ড ও জরিমানা: হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেয়াকে ‘শপথ ভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে, যাতে সর্বোচ্চ ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হওয়ার বিধান রয়েছে।

ভবিষ্যতে নির্বাচনে অযোগ্যতা: বড় ধরনের জালিয়াতি বা তথ্য গোপনের দায়ে দণ্ডিত হলে ওই ব্যক্তি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচনে লড়ার যোগ্যতাও হারাবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদের হিসাবে এত গড়মিল কেন?

আপডেট সময় : ০২:১৭:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন এলেই আলোচনায় আসে প্রার্থীদের দেয়া সম্পদের হিসাব বা হলফনামা (Election Affidavit)। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামায় সম্পদের অর্জিত মূল্য এবং বর্তমান বাজারমূল্যের (Market Value vs Acquisition Cost) মধ্যে বিশাল পার্থক্য নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি হলফনামায় মাত্র কয়েক লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

হলফনামার নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থীকে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ‘অর্জিত মূল্য’ বা কেনার সময়কার দাম উল্লেখ করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission – EC) ফরম্যাটে বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা না থাকায় প্রার্থীরা তাদের কয়েক দশক আগে কেনা জমির দাম সেই সময়ের হিসেবেই দেখাচ্ছেন। ফলে রাজধানীর অভিজাত এলাকার শতকোটি টাকার জমি হলফনামায় মাত্র কয়েক হাজার টাকা হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (SHUJAN) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে হলফনামায় বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ না করায় প্রার্থীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এটি মূলত সম্পদের তথ্য গোপনের (Hiding Assets Information) একটি আইনি ফাঁক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভোটাররা অভিযোগ করছেন যে, হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। একজন প্রার্থী ১০ বছর আগে যে সম্পদ দেখিয়েছেন, বর্তমানে তার মূল্য শতগুণ বাড়লেও কাগজে-কলমে তা অপরিবর্তিত থাকছে। এই তথ্যের অসঙ্গতি নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা (Electoral Transparency and Accountability) নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে যেকোনো প্রার্থীর হলফনামা (Affidavit) সরাসরি দেখা ও ডাউনলোড করা যায়। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ecs.gov.bd অথবা সরাসরি Affidavit Portal-এ প্রবেশ করুন।

ধাপ ২: মেনু থেকে ‘নির্বাচনি ফলাফল’ বা ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অপশনটি বেছে নিন।

ধাপ ৩: সেখানে ‘প্রার্থীগণের হলফনামা’ নামে একটি লিঙ্ক পাবেন। এতে ক্লিক করলে একটি নতুন পেজ ওপেন হবে।

ধাপ ৪: এরপর নির্দিষ্ট সংসদীয় আসন (যেমন: ঢাকা-১০) অথবা প্রার্থীর নাম লিখে সার্চ করুন।

ধাপ ৫: প্রার্থীর নামের পাশে থাকা ‘হলফনামা’ বা ‘Affidavit’ বাটনে ক্লিক করলে স্ক্যান করা পিডিএফ ফাইলটি দেখতে পাবেন।

প্রো-টিপ: টিআইবি (TIB)-র ‘Know Your Candidate (KYC)’ ড্যাশবোর্ড (ti-bangladesh.org/kyc) ব্যবহার করে আপনি প্রার্থীদের বিগত কয়েক বছরের সম্পদের তুলনামূলক চিত্র সহজেই দেখতে পারেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী হলফনামায় তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দেয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এর আইনগুলো হলো:

প্রার্থিতা বাতিল: যাচাই-বাছাইয়ের (Scrutiny) সময় যদি রিটার্নিং কর্মকর্তা নিশ্চিত হন যে কোনো প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারেন।

নির্বাচিত হওয়ার পরও পদচ্যুতি: কোনো প্রার্থী মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি তা প্রমাণিত হয়, তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার সংসদ সদস্য পদ (Membership) বাতিল হতে পারে।

কারাদণ্ড ও জরিমানা: হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেয়াকে ‘শপথ ভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে, যাতে সর্বোচ্চ ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হওয়ার বিধান রয়েছে।

ভবিষ্যতে নির্বাচনে অযোগ্যতা: বড় ধরনের জালিয়াতি বা তথ্য গোপনের দায়ে দণ্ডিত হলে ওই ব্যক্তি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচনে লড়ার যোগ্যতাও হারাবেন।