ঢাকা ০২:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গ্যাস-তেলের সঙ্কট, লকডাউনের পথে হাঁটছে ১০ দেশ

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:৪৬:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জের। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল বিশ্বের অন্তত ১০টি দেশে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বাড়ছে। এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফ্রান্স, আমেরিকা, জার্মানি, পোল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা এবং ইন্দোনেশিয়া; এই দেশগুলিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। কোথাও আবার তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এমনকি কিছু জায়গায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার লকডাউনের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ স্ট্রেট অফ হরমুজের পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়েই যায়। ফলে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। এমনটা চলতে থাকলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ থেকে ১৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এমনটাই আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

বিশ্লেষকদের মতে, এ অঞ্চলের বাইরের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং নরওয়ে, তাদের উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার যথেষ্ঠ ক্ষমতা নেই।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য বলছে, ইরাকে উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে, পাশাপাশি কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

জ্বালানির এই টানাপোড়েন শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সামরিক হামলার কারণ দেখিয়ে উৎপাদন স্থগিত করার পর বিশ্বের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণের কোনো সহজ উপায় না থাকায় জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে ‘দৃশ্যমান ঘাটতি’ দেখা দিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

এশিয়ায়, যারা বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশের কয়েক সরকার ইতোমধ্যে দামের ঊর্ধ্বসীমা এবং বিতরণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি পাকিস্তানে। সেখানে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি প্রায় ৫৫ পাকিস্তানি রুপি বেড়ে গিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে সরকার দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অফিস সপ্তাহে চার দিন খোলা রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও জ্বালানি ঘাটতির কারণে রেশনিং চালু করা হয়েছে। মহানগর এলাকায় রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেলের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ৫ লিটার এবং গাড়ির জন্য ১০ লিটার জ্বালানি নেওয়ার লিমিট করে দেওয়া হয়েছে। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে। পেট্রোল পাম্পে কালোবাজারি রুখতে কঠোর নজরদারি চলছে।

ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন পড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বহু মানুষ আতঙ্কে জ্বালানি মজুত করতে শুরু করেছেন। জার্মানিতেও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের উপর চাপ বাড়ছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস গোটা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পোল্যান্ডে গত এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও লুইজিয়ানা অঞ্চলে গ্যাস পাম্পে দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ১১ সেন্ট পর্যন্ত বেড়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের কারণে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ভিয়েতনাম সরকার সাধারণ মানুষকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। সেখানে বায়োফুয়েল এবং গণপরিবহণ ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম প্রায় ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জানিয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

বিশ্বের বহু দেশেই সরকার নাগরিকদের আগেভাগে জ্বালানি মজুত না করার আবেদন জানিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় এবং সংযমের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক দেশে অবৈধ মজুত বা কালোবাজারি রুখতে হটলাইন চালু করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে, তা হলে বিশ্ব অর্থনীতির উপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল বহু দেশের জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত কঠিন হতে পারে বলেই আশঙ্কা।

নিউজটি শেয়ার করুন

গ্যাস-তেলের সঙ্কট, লকডাউনের পথে হাঁটছে ১০ দেশ

আপডেট সময় : ১২:৪৬:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জের। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল বিশ্বের অন্তত ১০টি দেশে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বাড়ছে। এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফ্রান্স, আমেরিকা, জার্মানি, পোল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা এবং ইন্দোনেশিয়া; এই দেশগুলিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। কোথাও আবার তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এমনকি কিছু জায়গায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার লকডাউনের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ স্ট্রেট অফ হরমুজের পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়েই যায়। ফলে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। এমনটা চলতে থাকলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ থেকে ১৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এমনটাই আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

বিশ্লেষকদের মতে, এ অঞ্চলের বাইরের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং নরওয়ে, তাদের উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার যথেষ্ঠ ক্ষমতা নেই।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য বলছে, ইরাকে উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে, পাশাপাশি কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

জ্বালানির এই টানাপোড়েন শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সামরিক হামলার কারণ দেখিয়ে উৎপাদন স্থগিত করার পর বিশ্বের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণের কোনো সহজ উপায় না থাকায় জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে ‘দৃশ্যমান ঘাটতি’ দেখা দিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

এশিয়ায়, যারা বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশের কয়েক সরকার ইতোমধ্যে দামের ঊর্ধ্বসীমা এবং বিতরণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি পাকিস্তানে। সেখানে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি প্রায় ৫৫ পাকিস্তানি রুপি বেড়ে গিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে সরকার দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অফিস সপ্তাহে চার দিন খোলা রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও জ্বালানি ঘাটতির কারণে রেশনিং চালু করা হয়েছে। মহানগর এলাকায় রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেলের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ৫ লিটার এবং গাড়ির জন্য ১০ লিটার জ্বালানি নেওয়ার লিমিট করে দেওয়া হয়েছে। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে। পেট্রোল পাম্পে কালোবাজারি রুখতে কঠোর নজরদারি চলছে।

ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন পড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বহু মানুষ আতঙ্কে জ্বালানি মজুত করতে শুরু করেছেন। জার্মানিতেও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের উপর চাপ বাড়ছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস গোটা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পোল্যান্ডে গত এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও লুইজিয়ানা অঞ্চলে গ্যাস পাম্পে দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ১১ সেন্ট পর্যন্ত বেড়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের কারণে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ভিয়েতনাম সরকার সাধারণ মানুষকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। সেখানে বায়োফুয়েল এবং গণপরিবহণ ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম প্রায় ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জানিয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

বিশ্বের বহু দেশেই সরকার নাগরিকদের আগেভাগে জ্বালানি মজুত না করার আবেদন জানিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় এবং সংযমের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক দেশে অবৈধ মজুত বা কালোবাজারি রুখতে হটলাইন চালু করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে, তা হলে বিশ্ব অর্থনীতির উপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল বহু দেশের জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত কঠিন হতে পারে বলেই আশঙ্কা।