ঢাকা ০৫:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উর্ধ্বমূখী সবজির বাজার,কমেনি মুরগির দামের উত্তাপ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:১১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১১৩ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের বাজারে মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনি, এলপিজি, সবজিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

গেল কিছুদিনের তুলনায় প্রতিটি সবজির দাম এখন বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে মুরগির দাম, মাছের দামও । স্বস্তি নেই পেঁয়াজের দামেও; কেজিতে বেড়েছে আরও ৫ টাকা। তবে আলুর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে পরিবহনের খরচ বেড়েছে, সেই সঙ্গে অনেক সবজির মৌসুম শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম হওয়ায় বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সবজি।

দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মুরগি, সবজি, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। চাপে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে প্রোটিনের প্রধান উৎস মুরগির।

আজকের বাজারে প্রতি কেজি গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, বরবটি প্রতি কেজি ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, মুলা প্রতি কেজি ৫০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৬০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পটল প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, বাঁধা কপি প্রতি পিস ৪০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কচুর লতি প্রতি কেজি ৮০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা, সজিনা প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর শান্তিনগর বাজারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার করতে এসেছেন সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।‌ তিনি বলেন, আজকে বাজার করতে এসে দেখি বাজারে সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। গত সপ্তাহে যেগুলো কিনেছি, সেই তুলনায় আজ সব সবজির দাম বেড়েছে। গেল কিছুদিন ধরেই সব ধরনের সবজির দাম বাজারে বাড়তি দেখা যাচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। সে কারণে সবজির দাম বেড়েছে বাজারে।

সবজির দাম বৃদ্ধি বিষয়ে মালিবাগ বাজারের সবজি বিক্রেতা আফজাল হোসেন মৃধা বলেন, পাইকারি বাজারে সবজির কেনা দাম আগের তুলনায় আমাদের বেশি পড়ছে। এর মূল কারণ জ্বালানি তেলের কারণে পরিবহনের খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া অনেক সবজির মৌসুম এখন শেষ হয়ে যাচ্ছে, নতুন করে আবার সবজি উঠতে শুরু করবে। সব মিলিয়ে বাজারে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম হওয়ায় সবজির দাম কিছুটা বাড়তি যাচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় আজ প্রতিটি সবজি ভেদে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাই বাজারে আজ কিছুটা বাড়তি দামেই সব সবজি বিক্রি হচ্ছে। আশা করা যায় আগামী কিছুদিনের মধ্যে হয়তো সবজির দাম ফের কমে আসবে।

বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পাল্লা অনেক ভারী হয়ে গেছে। পরিবহন ভাড়ার অজুহাতে অসাধু সিন্ডিকেট দাম বাড়াচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের তদারকি জরুরি বলে মনে করেন তারা।

এদিকে গরু ও খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা কেজি দরে ।

সোনালি ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ২৭০ থেকে ৩২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। এর প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও। ৮০০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে না।

এদিন মুরগির পাশাপাশি মাছের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি লক্ষ্য করা যায়। ২২০ টাকার নিচে বাজারে কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল পাঙ্গাশ মাছ ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও আজ ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে তা বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়, যা গত তিন দিন আগেও বিক্রি হতো ২৮০ টাকা দরে। আর দুই কেজির চেয়ে বেশি ওজনের রুই মাছ ৩০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে তা বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। এ ছাড়া তেলাপিয়া, পাবদা, শোল, টেংড়াসহ সব মাছই কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে আজ বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা জানান, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যেক মাছেই কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া মাছের আমদানিও কমে গেছে।

ভলান্টারি কনজিউমারস ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান সজল বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে নানা পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিশেষ করে এলপিজি গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি সহজে পাওয়াও যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে, যা ভোক্তাদের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বাজারে সোনালি মুরগির দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অতীতে এই মুরগির দাম সাধারণত ৩০০ টাকার নিচে থাকত। বর্তমানে প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম ৪৫০ টাকায় পৌঁছেছে, যা ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগজনক।’

তিনি বলেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো—খামার পর্যায়ে মুরগির সরবরাহ কমে যাওয়া। কিছুদিন আগে থেকেই খামারিদের কাছে পর্যাপ্ত মুরগি নেই এবং অনেক খামারি উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে আলু ও পেঁয়াজের দাম তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।’

পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের দাম নাগালের বাইরে। আজ ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ইলিশ ২৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০০ টাকায়। এক কেজি ওজনের মাছ ৩০০০ থেকে ৩২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, ৫৫০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ মাছের দাম রাখল ১৩৮০ টাকা। বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের দাম একটু বেশি থাকে, কিন্তু এবার যে দাম, তা আমাদের মতো ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকারের উচিত বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের দাম বাজার মনিটরিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসা, যেন কোনো অসাধু ব্যবসায়ী জনগণকে জিম্মি করে অতিরিক্ত দাম রাখতে না পারে।

মহাখালী কাঁচাবাজারের ইলিশ মাছ বিক্রেতা শামীম হোসেন বলেন, এ বছর ইলিশের আমদানি খুবই কম। আমাদেরই বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে। তাই চাইলেও কম দামে আমরা মাছ বিক্রি করতে পারি না। যদি জেলেদের জালে বেশি পরিমাণে মাছ ধরা পড়ত, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ইলিশের দাম কম থাকত।

চিনির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। ঈদের আগে প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকটে বোতলজাত ও খোলা তেল বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাম অয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও এসব তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ের দর ১৯৫ টাকা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং আমদানি ব্যাহত হওয়ায় আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়েছে বলে কম্পানিগুলো আমাদের জানিয়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোজ্যতেলের বাজারে।

ভোজ্যতেল আমদানিকারক এক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক হারে ভোজ্যতেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। বিশ্ববাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়ছে।’

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসে। এপ্রিলে ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। যদিও বাজারে এই দরে ভোক্তারা কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ক্রেতারা বলছেন, বিক্রেতারা এখন বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার টাকার নিচে বিক্রি করছেন না। বাড়তি দর তাঁদের সংসারে চাপ তৈরি করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

উর্ধ্বমূখী সবজির বাজার,কমেনি মুরগির দামের উত্তাপ

আপডেট সময় : ০১:১১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

দেশের বাজারে মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনি, এলপিজি, সবজিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

গেল কিছুদিনের তুলনায় প্রতিটি সবজির দাম এখন বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে মুরগির দাম, মাছের দামও । স্বস্তি নেই পেঁয়াজের দামেও; কেজিতে বেড়েছে আরও ৫ টাকা। তবে আলুর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে পরিবহনের খরচ বেড়েছে, সেই সঙ্গে অনেক সবজির মৌসুম শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম হওয়ায় বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সবজি।

দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মুরগি, সবজি, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। চাপে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে প্রোটিনের প্রধান উৎস মুরগির।

আজকের বাজারে প্রতি কেজি গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, বরবটি প্রতি কেজি ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, মুলা প্রতি কেজি ৫০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৬০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পটল প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, বাঁধা কপি প্রতি পিস ৪০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কচুর লতি প্রতি কেজি ৮০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা, সজিনা প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর শান্তিনগর বাজারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার করতে এসেছেন সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।‌ তিনি বলেন, আজকে বাজার করতে এসে দেখি বাজারে সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। গত সপ্তাহে যেগুলো কিনেছি, সেই তুলনায় আজ সব সবজির দাম বেড়েছে। গেল কিছুদিন ধরেই সব ধরনের সবজির দাম বাজারে বাড়তি দেখা যাচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। সে কারণে সবজির দাম বেড়েছে বাজারে।

সবজির দাম বৃদ্ধি বিষয়ে মালিবাগ বাজারের সবজি বিক্রেতা আফজাল হোসেন মৃধা বলেন, পাইকারি বাজারে সবজির কেনা দাম আগের তুলনায় আমাদের বেশি পড়ছে। এর মূল কারণ জ্বালানি তেলের কারণে পরিবহনের খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া অনেক সবজির মৌসুম এখন শেষ হয়ে যাচ্ছে, নতুন করে আবার সবজি উঠতে শুরু করবে। সব মিলিয়ে বাজারে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম হওয়ায় সবজির দাম কিছুটা বাড়তি যাচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় আজ প্রতিটি সবজি ভেদে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাই বাজারে আজ কিছুটা বাড়তি দামেই সব সবজি বিক্রি হচ্ছে। আশা করা যায় আগামী কিছুদিনের মধ্যে হয়তো সবজির দাম ফের কমে আসবে।

বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পাল্লা অনেক ভারী হয়ে গেছে। পরিবহন ভাড়ার অজুহাতে অসাধু সিন্ডিকেট দাম বাড়াচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের তদারকি জরুরি বলে মনে করেন তারা।

এদিকে গরু ও খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা কেজি দরে ।

সোনালি ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ২৭০ থেকে ৩২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। এর প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও। ৮০০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে না।

এদিন মুরগির পাশাপাশি মাছের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি লক্ষ্য করা যায়। ২২০ টাকার নিচে বাজারে কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল পাঙ্গাশ মাছ ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও আজ ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে তা বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়, যা গত তিন দিন আগেও বিক্রি হতো ২৮০ টাকা দরে। আর দুই কেজির চেয়ে বেশি ওজনের রুই মাছ ৩০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে তা বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। এ ছাড়া তেলাপিয়া, পাবদা, শোল, টেংড়াসহ সব মাছই কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে আজ বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা জানান, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যেক মাছেই কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া মাছের আমদানিও কমে গেছে।

ভলান্টারি কনজিউমারস ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান সজল বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে নানা পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিশেষ করে এলপিজি গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি সহজে পাওয়াও যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে, যা ভোক্তাদের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বাজারে সোনালি মুরগির দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অতীতে এই মুরগির দাম সাধারণত ৩০০ টাকার নিচে থাকত। বর্তমানে প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম ৪৫০ টাকায় পৌঁছেছে, যা ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগজনক।’

তিনি বলেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো—খামার পর্যায়ে মুরগির সরবরাহ কমে যাওয়া। কিছুদিন আগে থেকেই খামারিদের কাছে পর্যাপ্ত মুরগি নেই এবং অনেক খামারি উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে আলু ও পেঁয়াজের দাম তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।’

পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের দাম নাগালের বাইরে। আজ ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ইলিশ ২৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০০ টাকায়। এক কেজি ওজনের মাছ ৩০০০ থেকে ৩২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, ৫৫০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ মাছের দাম রাখল ১৩৮০ টাকা। বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের দাম একটু বেশি থাকে, কিন্তু এবার যে দাম, তা আমাদের মতো ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকারের উচিত বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের দাম বাজার মনিটরিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসা, যেন কোনো অসাধু ব্যবসায়ী জনগণকে জিম্মি করে অতিরিক্ত দাম রাখতে না পারে।

মহাখালী কাঁচাবাজারের ইলিশ মাছ বিক্রেতা শামীম হোসেন বলেন, এ বছর ইলিশের আমদানি খুবই কম। আমাদেরই বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে। তাই চাইলেও কম দামে আমরা মাছ বিক্রি করতে পারি না। যদি জেলেদের জালে বেশি পরিমাণে মাছ ধরা পড়ত, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ইলিশের দাম কম থাকত।

চিনির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। ঈদের আগে প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকটে বোতলজাত ও খোলা তেল বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাম অয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও এসব তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ের দর ১৯৫ টাকা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং আমদানি ব্যাহত হওয়ায় আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়েছে বলে কম্পানিগুলো আমাদের জানিয়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোজ্যতেলের বাজারে।

ভোজ্যতেল আমদানিকারক এক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক হারে ভোজ্যতেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। বিশ্ববাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়ছে।’

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসে। এপ্রিলে ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। যদিও বাজারে এই দরে ভোক্তারা কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ক্রেতারা বলছেন, বিক্রেতারা এখন বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার টাকার নিচে বিক্রি করছেন না। বাড়তি দর তাঁদের সংসারে চাপ তৈরি করেছে।