ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিএসআর তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগ

গণভোট প্রচারণায় ব্যাংক থেকে সুজনের বদিউল আলম পান ২.৫ কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১২:৫৯:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের উদ্দেশ্য সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নয়ন হলেও, বাস্তবে এ অর্থের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সিএসআর তহবিল রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) একাংশের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার অনুদান গোপন ও তছরুপের অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনেন সংগঠনেরই অন্য অংশের নেতারা।

অভিযোগের পর রিফাত রশিদ সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে স্বীকার করেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ১ কোটি টাকা পাওয়া যায়। তবে বৈছাআ নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় সরাসরি তাদের নামে অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ‘সেড ফাউন্ডেশন’ নামে একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭ দিনের প্রচারণার জন্য অর্থ দেওয়া হয়।

তিনি দাবি করেন, মোট ৫ কোটি টাকার একটি চুক্তির কথা থাকলেও সময় সংকটের কারণে আংশিক অর্থ ছাড় করা হয় এবং ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য আরও কয়েকটি সংগঠন সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংগঠনের মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনী প্রক্রিয়া সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় সমঝোতা কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদারের সুজনকে (সুশাসনের জন্য নাগরিক) ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং স্বনামধন্য জনশক্তি ব্যবসায়ী হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২০ লাখ টাকা।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব অনুদান দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ অর্থ ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার ও নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজনের জন্য ব্যবহার হওয়ার কথা।

এ বিষয়ে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তারা এই অনুদান গ্রহণ করেছেন এবং যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ জানান, তারা সরাসরি কোনো পক্ষের প্রচারণা নয়, বরং নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজনের জন্য এ অর্থ ব্যবহার করেছেন।

গত ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকার্স সভা’য় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় সহযোগিতার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারের পরামর্শেই সুজন, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব আসে।

তবে বৈছাআ নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় তাদের অনুদান দেওয়ার প্রস্তাবে আপত্তি ওঠে এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়নি বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএসআর মূলত সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য ব্যয় করার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী— ৩০% শিক্ষা খাতে; ৩০% স্বাস্থ্য খাতে; ২০% জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা; ও ২০% অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যয় করার কথা।

এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রচারণায় সিএসআর তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই জমা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। এ অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, যেমন মুজিব বর্ষ উদযাপন, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিএসআর তহবিল থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।

সিএসআর তহবিলের উদ্দেশ্য সামাজিক উন্নয়ন হলেও বাস্তবে এর ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। সাম্প্রতিক গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারণায় এই তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ব্যয় যদি নীতিমালার বাইরে হয়ে থাকে, তবে তা আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

সিএসআর তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগ

গণভোট প্রচারণায় ব্যাংক থেকে সুজনের বদিউল আলম পান ২.৫ কোটি টাকা

আপডেট সময় : ১২:৫৯:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের উদ্দেশ্য সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নয়ন হলেও, বাস্তবে এ অর্থের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সিএসআর তহবিল রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) একাংশের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার অনুদান গোপন ও তছরুপের অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনেন সংগঠনেরই অন্য অংশের নেতারা।

অভিযোগের পর রিফাত রশিদ সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে স্বীকার করেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ১ কোটি টাকা পাওয়া যায়। তবে বৈছাআ নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় সরাসরি তাদের নামে অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ‘সেড ফাউন্ডেশন’ নামে একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭ দিনের প্রচারণার জন্য অর্থ দেওয়া হয়।

তিনি দাবি করেন, মোট ৫ কোটি টাকার একটি চুক্তির কথা থাকলেও সময় সংকটের কারণে আংশিক অর্থ ছাড় করা হয় এবং ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য আরও কয়েকটি সংগঠন সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংগঠনের মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনী প্রক্রিয়া সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় সমঝোতা কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদারের সুজনকে (সুশাসনের জন্য নাগরিক) ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং স্বনামধন্য জনশক্তি ব্যবসায়ী হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২০ লাখ টাকা।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব অনুদান দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ অর্থ ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার ও নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজনের জন্য ব্যবহার হওয়ার কথা।

এ বিষয়ে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তারা এই অনুদান গ্রহণ করেছেন এবং যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ জানান, তারা সরাসরি কোনো পক্ষের প্রচারণা নয়, বরং নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজনের জন্য এ অর্থ ব্যবহার করেছেন।

গত ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকার্স সভা’য় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় সহযোগিতার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারের পরামর্শেই সুজন, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব আসে।

তবে বৈছাআ নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় তাদের অনুদান দেওয়ার প্রস্তাবে আপত্তি ওঠে এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়নি বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএসআর মূলত সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য ব্যয় করার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী— ৩০% শিক্ষা খাতে; ৩০% স্বাস্থ্য খাতে; ২০% জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা; ও ২০% অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যয় করার কথা।

এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রচারণায় সিএসআর তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই জমা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। এ অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, যেমন মুজিব বর্ষ উদযাপন, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিএসআর তহবিল থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।

সিএসআর তহবিলের উদ্দেশ্য সামাজিক উন্নয়ন হলেও বাস্তবে এর ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। সাম্প্রতিক গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারণায় এই তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ব্যয় যদি নীতিমালার বাইরে হয়ে থাকে, তবে তা আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক।