ঢাকা ০২:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর, টিআইবির উদ্বেগ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৮:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৭৩ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে কতটা স্বাধীনভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল করা একজন তৈরি পোশাকশিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ী করপোরেট স্বার্থের প্রভাবমুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কতটা নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এই প্রশ্নও তুলেছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানায় টিআইবি।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নবনিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ত থেকে ঋণখেলাপি এবং পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলকরণ প্রক্রিয়াসংক্রান্ত। এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্প, আবাসন, অ্যাটাব, ঢাকা চেম্বার্সের মতো প্রভাবশালী ব্যবসা লবির অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে নতুন গভর্নরের। প্রশ্ন হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে খাদে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী লবি, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীনভাবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? বিশেষ করে যেখানে সংসদ সদস্যদের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রীপরিষদের ৬২ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা। তাছাড়া সংসদ সদস্যদের প্রায় ৫০ শতাংশ ঋণগ্রস্ত, যাঁদের মোট আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সেখানে একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যার বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলকরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যিনি তৈরি পোশাকশিল্প ও রিহাবের মতো খাতে নীতিদখলের সুবিধাভোগী, এমন একজনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগের প্রভাব ব্যাংক খাতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—সার্বিকভাবে এ নিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কী বার্তা দিচ্ছে, তা সরকারকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।’

ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দেশের ইতিহাসে প্রথম ব্যবসায়ী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অভূতপূর্ব এ নিয়োগের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবে আবারও কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলের মতো জাতীয় স্বার্থের তুলনায় খেলাপি ঋণ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতানির্ভর ব্যবসায়ী লবির করায়ত্ত ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হলো।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সদ্য ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বভার প্রদান কতটা বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতিহারে ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের যে অঙ্গীকার করেছে, তার সঙ্গে এ জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বপুষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রদান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক দলীয় বিবেচনা ও স্বার্থান্বেষী মহল-সহায়ক কার্যক্রমের কারণে পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলে ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা, অর্থপাচার ও খেলাপি ঋণসহ সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি তথা আর্থিক খাত কতটা নাজুক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তা বর্তমান সরকারের অজানা নয়।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগসহ যেখানে সার্বিকভাবে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা দেশের জন্য খুবই জরুরি, সে সময় এই নিয়োগের ঘটনা কতটা ফলপ্রসূ হবে। তা ছাড়া ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিতে ইতিমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ ও কার্যক্রমসমূহ কতটা বাস্তবায়িত হবে, সে ব্যাপারেও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ ব্যবসায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষণকারী দুর্বল ব্যাংকসমূহের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি আদৌ কি স্বাধীন ও নির্মোহভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের যে জনআকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা অন্যতম। এ ক্ষেত্রে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারদলীয় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বার্থের বাইরে গিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে সার্বিক ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ ও সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারবে?’

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর, টিআইবির উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০৪:৫৮:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে কতটা স্বাধীনভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল করা একজন তৈরি পোশাকশিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ী করপোরেট স্বার্থের প্রভাবমুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কতটা নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এই প্রশ্নও তুলেছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানায় টিআইবি।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নবনিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ত থেকে ঋণখেলাপি এবং পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলকরণ প্রক্রিয়াসংক্রান্ত। এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্প, আবাসন, অ্যাটাব, ঢাকা চেম্বার্সের মতো প্রভাবশালী ব্যবসা লবির অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে নতুন গভর্নরের। প্রশ্ন হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে খাদে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী লবি, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীনভাবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? বিশেষ করে যেখানে সংসদ সদস্যদের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রীপরিষদের ৬২ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা। তাছাড়া সংসদ সদস্যদের প্রায় ৫০ শতাংশ ঋণগ্রস্ত, যাঁদের মোট আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সেখানে একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যার বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলকরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যিনি তৈরি পোশাকশিল্প ও রিহাবের মতো খাতে নীতিদখলের সুবিধাভোগী, এমন একজনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগের প্রভাব ব্যাংক খাতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—সার্বিকভাবে এ নিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কী বার্তা দিচ্ছে, তা সরকারকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।’

ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দেশের ইতিহাসে প্রথম ব্যবসায়ী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অভূতপূর্ব এ নিয়োগের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবে আবারও কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলের মতো জাতীয় স্বার্থের তুলনায় খেলাপি ঋণ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতানির্ভর ব্যবসায়ী লবির করায়ত্ত ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হলো।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সদ্য ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বভার প্রদান কতটা বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতিহারে ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের যে অঙ্গীকার করেছে, তার সঙ্গে এ জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বপুষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রদান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক দলীয় বিবেচনা ও স্বার্থান্বেষী মহল-সহায়ক কার্যক্রমের কারণে পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলে ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা, অর্থপাচার ও খেলাপি ঋণসহ সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি তথা আর্থিক খাত কতটা নাজুক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তা বর্তমান সরকারের অজানা নয়।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগসহ যেখানে সার্বিকভাবে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা দেশের জন্য খুবই জরুরি, সে সময় এই নিয়োগের ঘটনা কতটা ফলপ্রসূ হবে। তা ছাড়া ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিতে ইতিমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ ও কার্যক্রমসমূহ কতটা বাস্তবায়িত হবে, সে ব্যাপারেও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ ব্যবসায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষণকারী দুর্বল ব্যাংকসমূহের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি আদৌ কি স্বাধীন ও নির্মোহভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের যে জনআকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা অন্যতম। এ ক্ষেত্রে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারদলীয় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বার্থের বাইরে গিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে সার্বিক ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ ও সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারবে?’