বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা তিন ভাগে বিভক্ত
- আপডেট সময় : ০২:১৮:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫ ৮৩ বার পড়া হয়েছে
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বিভেদ দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন ঘিরে। প্লাটফর্ম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে এবার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্যানেল থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দলের অমতে প্রার্থী হওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার দল থেকে বহিষ্কারও হয়েছেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫ নম্বর সমন্বয়ক ছিলেন।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিয়েছেন তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে চমক দেখাতে পারলে এনসিপির রাজনীতিতে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে, এমন ধারণা এনসিপি নেতাদের মধ্যে শুরু থেকে ছিল। যে কারণে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে যে সব আন্দোলন হয়েছে, সেখানে নেতৃত্বেও ছিলেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু ডাকসুর নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরুর পর দেখা গেছে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী ও এনসিপির কেউ কেউ আলাদা তিনটি প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এতে অন্তত এটি স্পষ্ট হচ্ছে যে একদিকে যেমন নিজ দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এনসিপি, অন্যদিকে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিভেদ আরো স্পষ্ট হচ্ছে। তবে কোন্দল বা বিরোধ হিসেবে না দেখে একে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবেই দেখছে এনসিপি।
এনসিপির সদস্য সচিব ও ডাকসুর সাবেক নেতা আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসগুলোয় আবহ তৈরি হয়েছে। ভয়ের পরিবেশ নাই। যে কারণে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যে কোনো দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে হলে অনেকগুলো শর্তের প্রয়োজন হয়। যেটি এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে না থাকায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিরোধ ও বিভেদ বাড়ছে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কারের দাবিতে সারাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তীব্র আন্দোলনে অসংখ্য প্রাণহানির পর গত বছরের ৩ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে। এরই মধ্যে ছাত্রদল, ছাত্র শিবির, বামজোটসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা মনোনয়ন সংগ্রহ করেছে।
এর পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের গঠিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদও (বাগছাস) ডাকসু নির্বাচনের মনোনয়ন সংগ্রহ করেছে। তারা বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলে নির্বাচন করবে। এই প্যানেলে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক দুই সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ভিপি পদে এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে আবু বাকের মজুমদার মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।
এই প্যানেল থেকে এজিএস পদে আশরেফা খাতুন নির্বাচন করবেন। এর মধ্যে আব্দুল কাদের ও আবু বাকের মজুমদার দুজনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক। আবু বাকের মজুমদার বর্তমানে বাগছাসের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ও আব্দুল কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
মনোনয়ন সংগ্রহের পর সোমবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে আবু বাকের মজুমদার বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলাম। আমরা আশাবাদী ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও মুখপাত্র ছিলেন উমামা ফাতেমা। গত জুনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এবার ডাকসু নির্বাচনে উমামার নেতৃত্বাধীন একটি প্যানেল আলাদাভাবে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এই প্যানেল নির্বাচনে লড়ছে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ ব্যানারে।
উমামা ভিপি পদে নির্বাচন করবেন। তার প্যানেলে জিএস ও এজিএস পদের জন্য আলোচনায় আছেন আল সাদী ভূঁইয়া ও মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহি। তারা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) নেতা। সাদী ডুজার সদ্য সাবেক সভাপতি আর মাহি বর্তমান কমিটির সভাপতি। দুজনই বর্তমানে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) কর্মরত।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব পদে ছিলেন। তিনি পৃথক প্যানেলে জিএস পদে নির্বাচন করবেন। তাদের প্যানেলে ভিপি পদে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ খালিদ এবং এজিএস পদে ফাতেহা শারমিন এনি নির্বাচন করবেন। আজ সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে বলে মাহিন সরকার তার ফেসবুকে জানিয়েছেন।
মাহিন সরকার ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে ‘গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ অভিযোগ এনে গত সোমবার (১৮ আগস্ট) তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে এনসিপি।
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) সালেহউদ্দিন সিফাত স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাহিন সরকার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নির্দেশক্রমে তাকে পদ ও দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পরেই সালেহউদ্দিন সিফাত গণমাধ্যমে একটি বার্তায় জানান, ডাকসু নির্বাচনে মনোনয়ন গ্রহণের আগে মাহিন সরকার দলের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি নেননি। এটি দলীয় শৃঙ্খলার গুরুতর ব্যত্যয় হিসেবে গণ্য হয়েছে।
মাহিন সরকারের কাছে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাড়া দেননি। তবে তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, “মাহিন সরকারের তার অনাগত সন্তানের কাছে বলার মতো গল্প আছে। মাহিন সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে তার রক্ত দিয়ে রাঙিয়েছে। গানপয়েন্টে ৬ জন সমন্বয়কের কর্মসূচি প্রত্যাহারের পর মাহিন সরকার বলেছিল ‘মানি না’। মাহিন সরকারসহ চারজন সমন্বয়কই বাকি সমন্বয়কদের বৈধতা দিয়েছে। মাহিন সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে ন্যায়বিচারে মাঠে নেমেছিল, কেউ আসেননি পাশে।”
‘আজকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করে দিলেন। সর্বোপরি, মাহিন সরকার তাদের একজন যার হাতে অভ্যুত্থানের ব্যানার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গঠিত হয়েছিল। অন্তত আমার কথাগুলো বলার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। যদি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম কিংবা চারিত্রিক স্খলনের মতো অভিযোগ থাকে তারপরও সংগঠনসমূহে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। আমি সে সুযোগও পাইনি, এটা সামগ্রিকভাবে নবগঠিত রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে গেল। আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি বিজয় আসমান থেকেই আসে, জমিনে তার প্রতিফলন হয় মাত্র।’ বলে উল্লেখ করেন মাহিন সরকার।
এ নিয়ে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বিবিসি বাংলাকে জানান, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে শীর্ষ নেতৃত্বকে মেসেজ দিয়ে জানিয়েছিলেন মাহিন সরকার। তবে জাতীয় রাজনীতির নেতা মাহিন সরকারকে ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থী হতে না করেছিল এনসিপি।
শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণের একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট নিয়ে এগুচ্ছিল বলে এনসিপির এক নেতা জানিয়েছিলেন বিবিসিকে।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ যদি নিজেরা বসে নিজেদের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে প্যানেলের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারতো তাহলে হয়তো সেটা আরেকটু ভালো হতো।’
কিন্তু কেন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি নিজ দলের নেতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলো না?
এর জবাবে আখতার হোসেন বলেন, ‘এই প্লাটফর্মে অনেক ঘরাণার মানুষ ছিল। তাদের একটা বড় অংশ অভ্যুত্থানের পর এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সবাইকে যদি আমরা একসঙ্গে পেতাম তাহলে হয়তো অবশ্যই ভালো হতো।’
ডাকসু নির্বাচন ঘিরে কেন্দ্রীয় নেতাকে বহিষ্কার কিংবা তিনটি প্যানেলে বিভক্ত হলেও এনসিপির এই নেতা মনে করছেন তা দলের জন্য বড় কোনো সংকট তৈরি করবে না।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এনসিপির রাজনৈতিক লক্ষ্য বা কর্মসূচি এখনো স্পষ্ট না। বহু তারা যদি তাদের রাজনীতি স্পষ্ট না করে তাহলে তো টেকার কোনো কারণ দেখি না।’

























রাঙামাটিতে সাংগ্রাই জলকেলিতে মাতলেন মারমা তরুণ-তরুণীরা