মজুত সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা
- আপডেট সময় : ১১:০০:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে
দিনভর জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর শনিবার রাতেও উপচে পড়া ভিড় ফিলিং স্টেশনগুলোতে। সন্ধ্যার পর রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্প বন্ধ হওয়ায় চাপ আরও বেড়ে যায়। এদিকে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরেও বৈশ্বিক সংকটে শঙ্কিত হয়ে বেশি করে তেল কিনতে চায় গাড়িচালকরা। এমন পরিস্থিতিতে সীমা বেঁধে দেয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণের সীমা বেঁধে দেয়ার পর ফিলিং স্টেশনগুলো দিনভর যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তবে সন্ধ্যার পর রাজধানীর কিছু ফিলিং বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন চালকরা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অনেকে তেল নিতে পারলেও কেউ কেউ খালি হাতে ফেরেন। যে কয়েকটা খোলা ফিলিং স্টেশন, রাতেও সেখানে সারিবদ্ধভাবে গাড়ি প্রবেশ করাতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্ধারিত হয়েছে ১০ লিটার।
স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) ও মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল পাবে। পিকআপ ও লোকাল বাস প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। অন্যদিকে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাকের জন্য দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেলের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বন্দরে একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস চলছে। আগামী সোমবার আরও দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। ফলে এ দুই ধরনের জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা এবং বেশি মুনাফার আশায় কিছু ব্যবসায়ীর মজুতের কারণেই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা আরও জানান, চলতি মাসে ১৪টি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর বেশিরভাগই ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং কয়েকটি পথে রয়েছে। আগামী মাসে ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টির সরবরাহ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে। বাকি দুটি কার্গো মে মাসে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে সরবরাহকারীরা।
চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তেল নিতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও ফিলিং স্টেশনগুলো তেল দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন অনেকেই।
গ্রাহকদের অভিযোগ, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে আবার ফেরত আসা লাগছে তাদের। মজুত থাকার পরেও তেল দিচ্ছে না অনেক স্টেশন। ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি তেল নেয়া যাচ্ছে না।
এদিকে সরকারি নির্ধারিত তেলের সীমা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাইড শেয়ার করা বাইকাররা। তাদের অভিযোগ, ট্রিপের কারণে তাদের অতিরিক্ত তেলের প্রয়োজন হয়।
পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফিলিং স্টেশনে কর্মকর্তারা। তারা জানান, সীমা বেধে দেয়ায় রোববার কম তেল বিক্রি হয়েছে।
মেঘনা ফিলিং স্টেশনের ইনচার্জ এস এম হাবিবুল্লাহ বলেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। আমরা সারাদিন আজকে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারবো। আমাদের কোনো স্বল্পতা নাই।
সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার হিমালয় মন্ডল বলেন, ভিড় যতই দেখছি ভিড় কিন্তু কমছে না। সকালে যে লাইন দেখেছি এখনও সেই লাইন। তাহলে আমরা যেগুলো সার্ভিস দিলাম সেগুলো তো কমার কথা।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী দিনের সংকট কাটাতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানিতেও কাজ করার কথা জানিয়েছে সরকার।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনার বিষয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চীনা জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকায় তেল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রায় ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ইস্টার্ন রিফাইনারির এক কর্মকর্তা জানান, পেট্রোলের প্রায় পুরোটাই উৎপাদন হয় দেশে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের পেট্রোল মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হয়। কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত পেট্রোলের পরিমাণ অনেক সময় দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এই পেট্রোলের সঙ্গে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়। ফলে দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটা এবং অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়।
দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। অন্যদিকে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গত কয়েকদিনে পাম্পগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তারা আশা করছেন।





















জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা, রোববার থেকেই কার্যকর