মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, খুলতে পারে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার
- আপডেট সময় : ০১:৩৫:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠান। আমন্ত্রণ ছিল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের পক্ষ থেকেও। এরপরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়েরও আমন্ত্রণপত্র আসে বেইজিং সফরের জন্য। শেষ পর্যন্ত ভারত বা চীন নয়, সরকারপ্রধান হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশীয় শ্রমবাজার আবার চালুর একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদেশ সফর হিসেবে কোন দেশে যাবেন তা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সরকার প্রধানের মালেশিয়া সফর প্রায় চুড়ান্ত।
এরপর তিনি যাবেন চীনে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে প্রতিবেশি দেশ ভারতে যাবেন এমন একটা আলোচনা চলছিলো কুটনৈতিক মহলে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের মালয়েশিয়া যাওয়ার সূচি ঠিক হয়েছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে ২১ থেকে ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুর সফর করবেন। এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন সরকারপ্রধানের চীন সফরের দিনক্ষণ ঠিক করা আছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা শ্রমবাজারের জট খুলতে পারে। ফের বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশীয় শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা আসতে পারে। তবে শিগগিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকার সোমবার (১ জুন) সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে চিঠি দিয়েছে। দুই দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ২২ জুন দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি আয়োজনের বিষয়ে কথা চলছে।বাংলাদেশ সংবাদ
এই সফরের আলোচ্যসূচি এবং বিস্তারিত কর্মসূচি এখনও ঠিক হয়নি। ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের দিকে এগুলো চূড়ান্ত হতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, শ্রমবাজারটা খুলে যাবে। ১০-১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য মালয়েশিয়া সফর প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে আলোচনা চলছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে বিষয়টি দ্রুতই পরিষ্কার হবে বলে মনে করেন তিনি।
২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তির বাজার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বন্ধ রয়েছে। একই বছরে মালয়েশিয়ার সরকার ঘোষণা করেছিল, আগে থেকে অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশের কর্মীদের ৩১ মে-এর মধ্যে দেশটিতে যেতে হবে। এরপর কর্মী ভিসায় আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। ওই তারিখের পর থেকে আর কোনো কর্মী যেতে পারেননি দেশটিতে। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দফায়-দফায় চেষ্টা করেও এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে পারেনি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ এই জনশক্তি বাজার আবার উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দ্রুতই বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজারটি খোলার সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন। বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথমবার বন্ধ হয় ২০০৮ সালে।
এরপর ২০১৬ সালে শ্রমবাজারটি আবার খোলা হলেও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও ২০২৪ সালে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ঐ বছরের ৩১ মে বন্ধ হওয়া দেশটির শ্রমবাজার এখনও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খোলেনি। দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবার শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি আশার আলো দেখালেও রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ, ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল।
এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, আবারও সিন্ডিকেটের কবলেই পড়তে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধন না করলে সিন্ডিকেট সুযোগ নেবেই। যদিও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সুযোগ দেওয়া হবে না। আমি যদি মন্ত্রী থাকি, এখানে কোনো সিন্ডিকেট হবে না। এবিষয়ে সরকারের নীতি জিরো টলারেন্স। ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয়। তাতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়। পরে মালয়েশিয়াকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ।
এই শর্তগুলো হলো গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও গত তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা বাধ্যতামূলক। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে অন্তত পাঁচ বছরের বৈধ লাইসেন্স থাকা, কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট ও বলপূর্বক শ্রম বা মানব পাচারে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড না থাকা।
বাংলাদেশে ২ হাজার ৫০০ এজেন্সি সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে লাইসেন্স পেয়েছে। এরমধ্যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি সই হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন মালয়েশিয়ায় গেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কুয়ালালামপুর সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি মালয়েশিয়ারে একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সে দেশের শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জ্বালানি, উচ্চশিক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, কৃষি, হালাল খাদ্য, আসিয়ান, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশের সহযোগিতার মতো নানা ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।


























দিল্লিতে হোটেলে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২১