ঢাকা ১১:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি: প্রায় ২৫০ যাত্রী নিখোঁজ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ৫২ বার পড়া হয়েছে
বৃত্তান্ত২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। উইওন নিউজ

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের টেকনাফ উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। যাত্রার সময় এতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৫০ জনেরও বেশি যাত্রী ছিল বলে জানা গেছে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি আন্দামান সাগরে পড়ে বিপর্যয়ের মুখে। প্রবল বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে এটি ডুবে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবছরই মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সমুদ্রপথে পাড়ি জমায়। তাদের অনেকেই কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হয়, যেখানে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ক্রমহ্রাসমান মানবিক সহায়তা তাদেরকে এই ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং আরকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষের কারণে নিরাপদে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক রোহিঙ্গা উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ছাড়ার সময় নৌকাটিতে প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল। এদিকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন।

উদ্ধারপ্রাপ্তদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম নামে একজন জানান, দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা মালয়েশিয়ায় কাজের আশায় এই যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, যাত্রাপথে ট্রলারের ভেতরে অনেককে আটকে রাখা হয়েছিল এবং সেখানে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। ট্রলার থেকে তেল ছিটকে পড়ে আমি দগ্ধ হই। দুর্ঘটনার পর আমরা প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসমান ছিলেন, পরে একটি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।

কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘মেঘনা প্রাইড’ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি গভীর সমুদ্রে ভাসমান কয়েকজনকে উদ্ধার করে। তারা তখন ড্রাম ও গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি এবং রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধানের অভাবের করুণ বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন বাড়ানো হয়।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর থেকেই রোহিঙ্গা সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। সে সময় ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের এক তদন্তে ওই অভিযানে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে, যদিও মিয়ানমার সরকার তা অস্বীকার করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ না হওয়া, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা না থাকা এবং শরণার্থী শিবিরে জীবনযাত্রার ক্রমাবনতি এই তিনটি কারণই রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে। সম্মিলিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি: প্রায় ২৫০ যাত্রী নিখোঁজ

আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। উইওন নিউজ

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের টেকনাফ উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। যাত্রার সময় এতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৫০ জনেরও বেশি যাত্রী ছিল বলে জানা গেছে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি আন্দামান সাগরে পড়ে বিপর্যয়ের মুখে। প্রবল বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে এটি ডুবে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবছরই মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সমুদ্রপথে পাড়ি জমায়। তাদের অনেকেই কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হয়, যেখানে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ক্রমহ্রাসমান মানবিক সহায়তা তাদেরকে এই ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং আরকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষের কারণে নিরাপদে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক রোহিঙ্গা উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ছাড়ার সময় নৌকাটিতে প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল। এদিকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন।

উদ্ধারপ্রাপ্তদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম নামে একজন জানান, দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা মালয়েশিয়ায় কাজের আশায় এই যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, যাত্রাপথে ট্রলারের ভেতরে অনেককে আটকে রাখা হয়েছিল এবং সেখানে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। ট্রলার থেকে তেল ছিটকে পড়ে আমি দগ্ধ হই। দুর্ঘটনার পর আমরা প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসমান ছিলেন, পরে একটি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।

কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘মেঘনা প্রাইড’ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি গভীর সমুদ্রে ভাসমান কয়েকজনকে উদ্ধার করে। তারা তখন ড্রাম ও গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি এবং রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধানের অভাবের করুণ বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন বাড়ানো হয়।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর থেকেই রোহিঙ্গা সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। সে সময় ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের এক তদন্তে ওই অভিযানে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে, যদিও মিয়ানমার সরকার তা অস্বীকার করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ না হওয়া, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা না থাকা এবং শরণার্থী শিবিরে জীবনযাত্রার ক্রমাবনতি এই তিনটি কারণই রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে। সম্মিলিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।