ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি বদলের গল্প
- আপডেট সময় : ০৮:৪২:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটির নাম ‘ফিফা বিশ্বকাপ’। চার বছর পর পর এই একটি ট্রফি ছুঁয়ে দেখার সোনালী স্বপ্নের পেছনে ছোটে গোটা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ।
ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই, মাঠের লড়াইয়ে বিশ্বজয় করার পরও মূল সোনার ট্রফিটি কোনো দেশই স্থায়ীভাবে নিজেদের ঘরে নিয়ে যেতে পারে না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বজয়ী দলটিকে আসল ট্রফির বদলে দেওয়া হয় ব্রাসের তৈরি নিখুঁত এক সোনা-মোড়ানো রেপ্লিকা বা অনুলিপি, যার গায়ে খোদাই করা থাকে সেই চ্যাম্পিয়ন দেশের নাম।
১৯৩০ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের যাত্রা শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত এই ট্রফির ইতিহাস মূলত দুটি ভিন্ন যুগে বিভক্ত। ১৯৭০ সালের পর ট্রফির নকশা, ওজন এবং উপাদানে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আজ দুই যুগের সেই ‘জুলে রিমে ট্রফি’ থেকে শুরু করে আধুনিক ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির আদ্যোপান্ত ও বিবর্তনের গল্প নিয়েই এই প্রতিবেদন।
প্রথম যুগ (১৯৩০-১৯৭০): দেবীর ডানায় মোড়ানো সোনালী ইতিহাস
ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম সংস্করণে যে ট্রফিটি জয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো, সেটির অফিশিয়াল নাম ছিল ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুল রিমের স্মরণে এই নামকরণ করা হয়েছিল, যিনি বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। সেটির নকশা করেছিলেন প্রখ্যাত ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লুর। এই ট্রফিটি পুরোপুরি খাঁটি সোনার ছিল না, বরং এটি তৈরি হয়েছিল রুপার ওপর সোনার নিখুঁত প্রলেপ দিয়ে।
এই ট্রফির মূল অনুপ্রেরণা ছিল প্রাচীন গ্রিক পুরাণের বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’। নকশায় দেখা যেত, ডানাযুক্ত বিজয়ের দেবী দুই হাতে একটি প্রাচীন পাত্র মাথার ওপর তুলে ধরে আছেন। ট্রফিটির উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার এবং এর ওজন ছিল ৩.৮ কেজি।
১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই ট্রফিটি জয়ের জন্য লড়েছে ফুটবল বিশ্ব। সে সময় ফিফার একটি ঐতিহাসিক নিয়ম ছিল—যে দেশ অন্তত তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারবে, এই মূল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে চিরকালের জন্য তাদের দিয়ে দেওয়া হবে। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইতালিকে হারিয়ে পেলে-টোস্তাওদের ব্রাজিল যখন তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজয় করে, তখন নিয়ম অনুযায়ী এই আদি ট্রফিটি চিরতরে ব্রাজিলের হয়ে যায়।
প্রথম যুগে বিশ্বজয়ী দেশগুলো:
ব্রাজিল: ৩ বার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) — যার সুবাদে ট্রফিটি তারা স্থায়ীভাবে পায়।
ইতালি: ২ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮)
উরুগুয়ে: ২ বার (১৯৩০, ১৯৫০)
জার্মানি: ১ বার (১৯৫৪)
ইংল্যান্ড: ১ বার (১৯৬৬)
আধুনিক যুগ (১৯৭০ থেকে বর্তমান): দুই মানবের হাতে ধরা পুরো পৃথিবী
১৯৭০ সালে জুলে রিমে ট্রফিটি ব্রাজিলকে স্থায়ীভাবে দেওয়ার পর ফিফাকে নতুন একটি ট্রফি তৈরির উদ্যোগ নিতে হয়। ১৯৭১ সালে ইতালির বিখ্যাত ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা এক অনবদ্য এবং আধুনিক ট্রফির নকশা তৈরি করেন। বর্তমান বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের চেনা ট্রফিটি মূলত তাঁরই সৃষ্টি। এটি তৈরি করে ইতালির বিশ্বখ্যাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জিডিই বার্টোনি।
নতুন যুগের এই ট্রফিটির উপাদানেও আসে আভিজাত্য। এটি তৈরি করা হয় ১৮ ক্যারেট খাঁটি সোনা দিয়ে। এর নকশাতেও রয়েছে গভীর গভীরতা—এখানে দেখা যায়, দুজন ডানাওয়ালা বিজয়ের মানবমূর্তি পিছন থেকে পুরো পৃথিবী বা একটি গ্লোবকে পরম মমতায় ওপরের দিকে তুলে ধরে রাখছে।
আগের ট্রফির তুলনায় এটি আকারে এবং ওজনে বেশ বড়। বর্তমান ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং এর ওজন প্রায় ৬.২ কেজি। ফুটবলারদের এই ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে আগের চেয়ে বেশ কসরত করতে হয়! ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার এই নতুন ট্রফিটি উন্মোচন করা হয়। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিও এই ট্রফিটিই উঁচিয়ে ধরেছিলেন।
আধুনিক যুগে বিশ্বজয়ী দেশগুলো (১৯৭৪-২০২২):
জার্মানি: ৩ বার (১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪)
আর্জেন্টিনা: ৩ বার (১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২)
ইতালি: ২ বার (১৯৮২, ২০০৬)
ব্রাজিল: ২ বার (১৯৯৪, ২০০২)
ফ্রান্স: ২ বার (১৯৯৮, ২০১৮)
স্পেন: ১ বার (২০১০)
ফুটবলের এই দুই যুগের ট্রফি বদলের গল্পটি আসলে ফুটবল খেলাটিরই বিবর্তনের প্রতীক। ১৯৩০ সালের সেই দেবীর পাত্র থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বকে হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরার এই ট্রফি—উভয় যুগেই এটি ফুটবলারদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এবং গুরুত্বপূর্ণ এক বস্তু হিসেবে অমর হয়ে আছে।
























রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী